Skip to main content
Internet Archive's 25th Anniversary Logo

Full text of "Thakur Haridas"

See other formats


রথ 


“ঠাকুর হরিদাস” কতিপয় ধারাবাহিক প্রবন্ধে স্থপ্রসিদ্ধ 
মাসিক পত্র “নারায়ণে” প্রকাশিত হইয়াছিল। স্থানে স্থানে 
সামান্য পরিবর্তন করিয়া এই গ্রন্থ গ্রথিত হইল। নভেল- 
প্লীবিত নব্য বঙ্গে ঠাকুর হরিদাসের কিরূপ আদর হইবে তাহা 
ঠাকুর জানেন। ইতি-- 


বৈশাখ ১৩২৭ | শ্্রীরেবতীমোহন সেন 
কলিকাতা 


ঠাকুর হরিদাদ 


৮৮ চারার 0 এরি, & চারার ওারজরহরার 


প্রথম পরিচ্ছেদ 
দেশের অবস্থা 


হরিদাস ঠাকুর যে লময়ে জন্মগ্রহণ করেন, তাহার প্রায় 
আড়াই শত বশসর পূর্ব হইতে বঙ্গদেশে মুললমানের শাসন 
প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। এই আড়াই শত বৎসরে বাঙ্গালার বু 
হিন্দুস্তান নবাবী-শাদনের তীব্রতা সহিতে না পারিয়া, মহ্মদীয় 
ধর্মে দীক্ষিত হইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। যাহার! হিন্দু থাকিলেন, 
তাহাদের অনেকেরই আচার-ব্যবহার, ভাষা ও আদব-কায়দা 
অনেকটা মুসলমানী ছাঁচের হইয়া পড়িল। খাঁটি হিন্দুকে সতত 
সন্ত্রস্ত হইয়া থাকিতে হইত। কারণ কাজীর বিচারে কখন 
কাহার শ্রাদ্ধ কোথায় গিয়া যে গড়াইত, তাহার স্থিরতা ছিল না। 
কখন কখন “উদ্দোর পিগু বুধোর ঘাড়ে, যাইয়া পড়িত। তবে 
সে কালে মোট] ভাত মোট! কাপড়ের জন্য কেহ ভাবিত না। 
প্রচুর পরিমাণে শহ্যাদি দেশে সঞ্চিত থাকিত। ' সাধারণ 
লোকের! ধর্মভীরু ছিল, কিন্তু শাস্ত্রের প্রকৃত মর্মার্থ প্রায় কেহ 
বুঝিত না। বাহার! খুব বাহ আড়ম্বর করিয়া ধর্মকর্ম করিতে 


ঠাকুর হরিদাস 


রিতেন, তীহারাই যশস্বী হইতেন। আত্মীয়-স্বজনের গীড়া 
ইলে সত্যনারায়ণের সিম্নী ও মঙ্গলচণ্ীর পূজা দেওয়া, সর্ভয়ে 
[বহরীর গান শুন! এবং আয়ুর্দ্ধি ও সম্তানলাভাদ্দির কামনায় 
বতাবিশেষকে মানস কর প্রভৃতি সাধারণতঃ ধর্ম-কন্মের অঙ্গ 
ল। কেহ কেহ দোলছুর্গোৎসবও করিতেন । 
পগ্ডিতগণ খুব শান্্রচ্চা করিতেন। তীহারা অনবরত 

স্ত্রের লড়াই করিয়া কাল কাটাইয়া দিতেন । অনেকে অদ্বৈত- 
দীছিলেন। ব্রহ্ষত্ান যে জীবনে লাভ করিতে হয়, সে দিকে 
য় কাহারও দৃষ্টি ছিল না। সগুণ ব্রহ্ম, নিগুণ ব্রহ্ম, আত্মা, 
াত্মা ও মায়া লইয়া ঘাটে পথে বাদবিতগ্ডা করিয়াই তাহার! 
নের গৌরবে দৃপ্ত থাকিতেন। প্রকৃত ভগবদুপাসনা, 

'বন্তক্তি এখানে সেখানে অতি অল্পসংখ্যক লোকের মধ্যে 

দ্ধছিল। এই সময়ে দেশমধ্যে বামাচারী শাক্ত সাধকদিগের 

চাবও নিতান্ত অল্প ছিল না। তাহাদের কপালে রক্তুচন্দনের 

টা, গলে কুদ্রাক্ষমাল। ও হস্তে স্ুরাপূর্ণ নর-কপাল শোভা 

ত। সাধারণ লোকের! তাহাদিগকে সিদ্ধপুরুষ জ্ঞান করিত 

; ভীহাদের ভয়ে সর্বদা তটস্থ থাকিত। 


প্র্মকর্ম লোক সবে এই মাত্র জানে, 

মঙ্গলচণ্ডীর গীত রাত্র-জাগরণে। 

বান্থুলী পূজয়ে কেহ নান! উপহথারে, 

মন্ত-মাংস দিয়! কেহ বজ্ঞ পূজ। করে ।৮- 
(শ্রীচৈতন্ত-ভাগবত ) . 


প্রথম পরিচ্ছেদ ৩ 


এই সকল পারিপার্থিক অবস্থার ভিতরে আমাদের হরিদাস 
ঠাকুর জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন । 


জন্ম ও গৃহত্যাগ। 


কলিপাবন প্রেমের ঠাকুর শ্রীগৌরাঙ্গ হরিদাস ঠাকুরের 
পবিত্র চরিত্রমাধূর্ধ্য ও ভক্তি-মাহাত্্য আপন শ্রীমুখে কীর্তন 
করিতে করিতে বলিয়াছিলেন, “হরিদাস! আমি কেবল 
আপনাকে পবিত্র করিবার নিমিত্ুই তোমাকে স্পর্শ ও আলিঙ্গন 
করিলাম । ইহাতে তুমি কেন সঙ্কোচ করিতেছ ? ফলত; 
তুমি ব্রাহ্মণ-সন্ন্যাসী হইতেও পবিভ্র1% 


“প্রভু কহে তোম' স্পর্শি পবিত্র হইতে, 
তোমার পবিত্র ধর্ম নাহিক আমাতে । 
ক্ষণে ক্ষণে কর তুমি সর্বতীর্থে স্নান, 
ক্ষণে ক্ষণে কর তুমি যজ্ঞ তপ দান। 
নিরস্তর কর চারি বেদ অধ্যয়ন, 
ছ্বিজ স্তাসী হইতে তুমি পরম পাবন।” 
( শ্রীচৈতন্ত-চরিতামৃত ) 


শ্রীচৈতম্যভাগবতকার ব্রাহ্মণকুমার শ্রীল বুন্দাবনদাস হরিদাস 
ঠাকুরের মহিমায় মুগ্ধ হইয়া অসঙ্কোচে প্রাণের আবেগে বলিয়া 
গিয়াছেন-_- 
“হবিদাস-ম্পর্শ বাঞ্া করে দেবগণ, 
'তাঙ্গাও বাঞ্ছেন হরিদাসের মজ্জন। 


্ ঠাকুর হরিদাস 
স্পর্শের কি দায় দেখিলেই হরিদাস, 
ছিও্ডে সর্বজীবের অনাদি কম্মপাশ |” 
( প্রীচৈতন্ত-ভাগবত ) 


এ হেন হরিদাস ঠাকুরের জন্ম হইয়াছিল-য্বনকুলে । 
এ নিমিত্ত তিনি সাধারণতঃ “যবন হরিদাস” নামে খ্যাত, ছিলেন । 
শ্রীগৌরাঙ্গভক্ত বৈষ্ণবগণের বিশ্বাস যে, স্বয়ং চতুরাধন ব্রক্ষ। 
শ্রীকৃষ্ণের ধেনু-বস অপহরণের অপরাধে নীচ যবনকুলে আসিয়া 
জন্মগ্রহণ করেন। গুঢ় কারণ, শ্রীগৌরাঙ্গলীলায় যোগদান 
করা। এই কারণে তিনি 'ব্রঙ্গ-হরিদাস” নামেও অভিহিত 
হইতেন। কেহ বলেন যে, তিনি ব্রাহ্ষণ-কুলে জন্মিয়া নিতান্ত 
শৈশবেই মাতৃহীন ও পিতৃহীন হওয়াতে যবন-গুহে লালিত- 
পালিত ও যবনত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু প্রামাণিক 
বৈষ্ণবগ্রন্থে সেরূপ ইতিহাস কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না। 
'আ্রীল বৃন্দাবন দাস হরিদাস ঠাকুরের অব্যবহিত পরবর্তী কালের 
লৈখক। তিনি স্থীয় গ্রন্থে স্পষ্ট কথায় লিখিয়াছেন-_ 


“জাতি কুল সব নিরর9৫থক বুঝাইতে, 
জন্মিলেন হরিদাস প্রভুর আজ্ঞাতে। 
অধম কুলেতে যদি বিষুঃভক্ত ছয়, 
তথাপি সেই লে পুজ্য সর্বশাস্ত্রে কয় 
উত্তম কুলেতে বদি ভ্রুণ না ভে, 
কুলে তার কি করিবে নরকেতে মজে 


প্রথম পরিচ্ছেদ € 


এই সব বেদবাক্য সাক্ষী দেখাইতে, 
জন্মিলেন হরিদাস অধম কুলেতে 1” 
( গ্রীচৈতন্ত-ভাগবত ) 


ভক্তিনিধি শ্রীযুক্ত অচ্যুতচরণ চৌধুরী মহাশয় তাহার গ্রন্থে 
লিখিয়াছেন যে, হরিদাস হিন্দুসস্তান, তাহার মাতার নাম গৌরী- 
দেবী এবং পিতার নাম সুমতি শর্মা, কিন্তু এ বিষয়ে তিনি 
কোনও প্রমাণ দেখান নাই। আবার জয়ানন্দকৃত চৈতগ্যমঙ্গলে 
দেখিতে পাই যে, হরিদাস ঠাকুরের মাতার নাম উজ্্বলা, পিতার 
নাম মনোহর । এরূপ পরস্পরবিরুদ্ধ কথার উপর বিশেষ 
আস্ম। স্থাপন কর! যায় না। 

যাহা হউক, জন্মতঃই হউন, কি অন্য গ্রকারেই হউন, তিনি 
যবন ছিলেন, ইহা সর্বববাদিসন্মত কথা । ক্রমে তাহা প্রকাশ 
পাইবে। 

১৩৭২ শকে (১৪৫০ খৃঃ) যশোহর জিলার অন্তর্গত বনগ্রাম 
বিভাগস্থ বু নামক একটি ক্ষুদ্র পল্লীগ্রামে হরিদাস ঠাকুর 
জন্মগ্রহণ করেন। 


প্ত্রয়োদশ শত দ্বিসগুতি শক মিতে, 
গ্রকট হুইল! ব্রহ্মা! বুঢ়ণ গ্রামেতে। 
(ভ্রীঅস্ৈত; প্রকাশ ) 


হরিদাস আজন্ম বৈরাগী। তিনি বাল্যকালেই গৃহত্যাগ 
করেন এবং নানা স্থান পরিভ্রমণ করিয়া অবশেষে বেণাপোলের 


৬ ঠাকুর হয়িধাস 


জঙ্গলে আসিয়া আসন স্থাপনপূর্ববক একাস্ত ভজনে রত হয়েন। 
এই বেণাপোলও বনগ্রাম-বিভাগেরই একটি গ্রাম । এই সময়ে 
তিনি পূর্ণবয়স্ক যুবক। এতদিন হরিদাস কোথায় ছিলেন বা কি 
করিয়াছিলেন, তাহা জানিবার কোনও উপায় নাই, তবে এই 
বেণাপোলে যখন তিনি প্রথম আসিলেন, তখন লোকের! । দেখিল 
যে, তীহার রসনায় অবিরাম হরিনাম উচ্চারিত হইতেছে, নয়নে 
প্রেমাশ্রুধারা, সর্ববাঙ্গে পুলক ; ঠাকুর দিবানিশি হুরিনাঁম-রসে 
বিভোর । এমন হরিভক্তি, এমন দেবছুল্লভি. অবস্থ তিনি 
কেমন করিয়। লাভ করিলেন, তাহা সম্যক জানা যায না। এ 
জিনিষ তখন বঙ্গদেশে নিতান্ত স্বলভ ছিল না। 

হরিদাস ঠাকুরের সময়ে বৈষ্ণব সন্স্যাসীদিগের মধ্যে 
অনেকেই তীর্থদর্শন উপলক্ষে বঙ্গদেশের নান! স্থানে পরিভ্রমণ 
করিতেন। তাহারা কৃপাপরবশ হইয়া সময় সময় স্তবপাত্র 
দেখিয়া কাহাকেও কাহাকেও হরিনাম প্রদান করিভেন, এমত 
প্রমাণ পাওয়া যায়। এইরূপে স্বয়ং শ্রীঅদ্বৈত প্রভু, পুগ্ুরীক 
বি্ভানিধি, ও চৈতন্যবল্পভ দত্ত প্রভৃতি অনেকে শ্রীপাদ মাধবেন্দ্ 
পুরীর নিকট কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত হইয়াছিলেন। মাধবেন্দ্র পুরী 
মহাশয় মধ্বাচার্য্যের পঞ্চদশ পুরুষ অধস্তন প্রধান শিশ্। 
তিনি কৃষ্ণতক্তি-গ্রদানে অসাধারণ শক্তিশালী সমর্থ গুরু। 
তাহার কৃষ্ণপ্রেম অদ্ভুত। আকাশে মেঘ দেখিলেই তাহার 
হৃদয়ে সেই নবজলধর-শ্যাম শ্যামনুন্দরের ভূবনমোহন শ্যাম- 
কান্তি স্ফ,প্তি পাইত, অমনি তিনি সমাধিস্থ “হুইয়। কৃষ্ণরূপে 


প্রথম পরিচ্ছেদ, খ 


ডুবিয়া যাইতেন। কৃষ্ণতক্তি দিতে তাহার ন্যায় শক্তিশালী গুরু 
আর কে? হরিদাস ঠাকুরের জীবনে যে প্রকার প্রেমভক্তির 
বিকাশ হইয়াছিল, তাহার ভিতরে শ্রীপাদ মাধবেন্দ্রের প্রেমের 
গন্ধ পাওয়া যায় ও তাহার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ অনুমিত হয়। অনেক 
বৈষুব মহাজনের বিশ্বাস যে, হরিদাস উদামীনভাবে ঘুরিতে 
ঘুরিতে কোন শুভ মুহুর্তে স্বয়ং মাধবেন্দ্র পুরীরই কৃপা লাভ 
করিয়াছিলেন । 

হরিদাস উদাসীন ভক্ত, হরিনামজপে একান্ত অন্ুরক্ত । 
প্রতিনিয়ত হরিনাম করাই তাহার ব্রত, একটি শ্বাসও বৃথা ব্যয় 
করিতে তাহার “প্রাণে ক্লেশ হয়। এই কারণে তিনি জন- 
কোলাহল হইতে একটু দুরে থাকিবার আশায় বেণাপোলের 
নির্জন বনপ্রদেশই তাহার ভজনে” অনুকূল স্থান বলিয়া 
বাছিয়া লইলেন এবং তথায় থাকিয়া বৃক্ষমূলে বসিয়া! দিবানিশি 
স্বীয় প্রিয় হরিনাম কীর্তন করিতে লাগিলেন । 

সরোবরে সুরভি কমল প্রস্ফ,টিত হইয়া আপন মনে আপনি 
হাসিতে থাকে, সে কাহাকেও ডাকে না, কাহাকেও খোজে না। 
কিন্তু তথাপি তাহার হৃদয়ে যে মধু-সম্পত্তি রহিয়াছে, তাহার 
সৌরভে আকৃষ্ট হইয়া, দূরদুরাস্তর হইতে মধুকর আসিয়া তাহাতে 
সঙ্গত হয়। ধাঁহারা ভগবন্তক্ত, কৃষ্চভক্তিরস-ভাবিত ধাহাদের 
হৃদয়, তাহাদের হুদয়-নিহিত ভক্তির প্রভাব, যেন মধু 
সৌরভের ম্যায় বিস্তৃত হইয়া, চতুদ্দিক হুইতে ভক্তি-পিপান্থু 
জনগণকে নিকটে আকর্ষণ করিয়া আনে। সেই নির্জন 


৮ ঠাকুর হরিদাস 


অরণ্যেও হরিদাস নির্জনে থাকিতে পারিলেন না। তাহার 
স্থমুর কণ্টনি:স্যত মধুমাখা হরিনাম শুনিবার নিমিত্ত সে স্থানে 
ক্রমে লোকসমাগম হইতে লাগিল এবং এইরূপে যাহারা আসি- 
লেন, তাহারা তাঁহার দিব্য তেজঃপুপ্ গৌরকাস্তি ও ভক্তি- 
বিগলিত নিষ্ষিঞ্চনভাব দর্শন করিয়া মুদ্ধ হইয়া গেলেন । তীহারা 
হরিদাস ঠাকুরের ভজনের নিমিত্ত সেই অরণ্যে একটি) পর্ণ-কুটীর 
"্বাধিয়া দিলেন । 

হরিদাস ঠাকুর সেই তৃণ-কুটারে থাকিয়া অহোরাত্র নাম- 
জপে কাল কাটাইতে লাগিলেন । প্রতিদিন অন্ততঃ তিন লক্ষ 
হরিনাম জপ করিতেন । তীহার নিয়ম ছিল, প্রতিমাসে এক 
কোটী নাম জপ করা। তিনি তীহার কুটারের নিকট একটি 
তুলসী বৃক্ষ রোপণ করিয়াছিলেন। প্রতিদিন প্রত্যুষে উঠিয়া 
তাহার মূলে জল সেচন ও সাফীঙ্গ প্রণিপাত করিয়া নাম-জপে 
বসিতেন। হরিদাস নামরসে বিভোর হইয়! অনুক্ষণ নামানন্দে 
মগ্ন থাকিতেন, দেহ-গেহ ভুলিয়া যাইতেন, ক্ষুধা-তৃষ্গা-জ্ঞানও 
ত্বীহার থাকিত লা। প্রীতঃকালে তুলসী সেবা করিয়া একবার 
নাম-জপে বসিলেই কোথা দিয়া যে সময় চলিয়৷ যাইত, তাহা 
ভিনি বুঝিতেন না। এক বৈঠকেই একবারে বেলা শেষ ! 
স্ৃতরাং তিনি নিজের জন্য রীধিবেন কখন ? আবারও ত 
নামজপে" বসিতে হইবে, দিবারাত্রে তিনলক্ষ নাম পূর্ণ হওয়া 
চাই ত? পক্ষান্তরে শরীরকে কিছু আহার না যোগাইলেও সে 
বিগড়াইয়া যায়, সে বিগড়াইলে ভজন হয় না। তাই তিনি 


প্রথম পত্বিচ্ছেদ ৯ 


সন্ধ্যা হইতে না হইতেই দ্রতপদে নিকটবর্তী গ্রামে যাইয়া 
এক এক দিন এক এক ব্রাহ্গণ-গৃহস্থের গৃহে ভিক্ষান্স গ্রহণ 
করিয়া আসিতেন। প্রাতে ও সন্ধ্যায় তৃলসী-প্রণাম, আর দিন- 
রাত জাগিয়! নামকীর্তন, ইহাই ছিল হরিদাস ঠাকুরের ভজন । 

“নির্জন বনে কুটীর করি তুলসী সেবন, 

রাত্রি দিনে তিন লক্ষ নাম সংকীর্ততন, 

ব্রাহ্মণের ঘরে করে ভিক্ষা নির্বাহণ, 

প্রভাবে সকল লোক করয়ে পৃজন 1” 

( শ্রীচৈতন্ত চরিতামূত ) 


সকলে নাম জপ করে মনে মনে, আর হরিদাসঠাকুর নাম 
করিতেন উচ্চৈঃস্বরে ৷ তাহার স্বাভাবিক সুমধুর ক ভাবে 
ভারি হইয়া যখন জগম্মঙগল হরিনাম উচ্চারণ করিতে থাকিত, 
তখন বুঝি বা বনের পশু-পক্ষীও তাহা শুনিয়া মোহিত হইত। 
গ্রামের লোকেরা সেই আকর্ষণে আসিয়! ঠাকুরের কুটারের ক্ষুন্ 
আঙ্গিনায় জড় হইত। বালক, বৃদ্ধ, যুবা, সকলেই আসিত। 
তাহার! তৃষিত নেত্রে সেই দেবোপম মুস্তি দর্শন করিত আর 
মুগ্ধচিত্তে সেই প্রাণগলান মনভুলান হরিনাম বসিয়া বসিয়া 
শুনিত। কেহ কেহ বা হরিদাসঠাকুরের সেবার জন্য বিবিধ, 
ফলমূল আনিয়।৷ ভক্তিপুর্ববক তাহার আসনের সম্মুখে রাখিয়া 
দিত। ঠাকুর হরিদাল হরিধ্বনি করিতে করিতে তৎসমুদয় 
বালক বৃদ্ধ সকলকে বিলাইয়া দ্িতেন। ইহাতে বালকদিগের 
আনন্দে গঃচমো 'থাকিত না। তাহারা ফলমূল পাইয়া মনের 


১০ ঠাকুর হরিদাস 


আনন্দে হরিবোল বলিয়া নৃত্য করিত। বুৃদ্ধেরাও হরিদাস 
ঠাকুরের হাতের হরির লুট পাইয়া ভক্তিভরে তাহা মস্তকে 
ধারণ করিতেন এবং নিজে কিঞ্চিৎ গ্রহণ করিয়া! অবশিষ্ট গৃহে 
লইয়া যাইতেন। এইরূপে সে স্থানে প্রতিদিন আনন্দ-বাজার 
বদসিত। বোধ হয় এই ঘটনা উপলক্ষ করিয়াই পদকর্তী 
দৈবকীনন্দন দাস তাহার রচিত বৈষ্ণব-বন্দনায় লিখিস়্াছেন-_ 


“হরিদাস ঠাকুর বন্দ বীরত্ব প্রধান, 
দ্রব্য দিয়! শিশুরে লওয়াইল৷ হরিনাম ৮ 


এইরূপে দেশের মধ্যে হরিদাস ঠাকুরের একটা নাম পড়িয়া 
গেল। ক্রমে দূরবর্তী স্থানসকল হইতেও ভদ্রাভদ্র নানা শ্রেণীর 
লোক আসিয়া ঠাকুরকে দেখিয়৷ যাইতে লাগিল। সকলেরই 
মুখে হরিদাসের প্রশংসা । উহা কেবল মুখের প্রশংসা নহে, 
'খোলাপ্রাণে মুখভর। প্রশংসা । কাবণ, মানুষ যে এমন দেবতা 
হইতে পারে, এ কথা তাহারা কখনও শুনেও নাই এবং 
এমনটি আর দেখেও নাই। তীহ্থার প্রশান্ত গম্ভীর মুত্তি ও 
প্রেমে চল ঢল প্রসন্নবদন চক্ষে পড়িবামাত্র আপনা হইতেই 
লোকের প্রাণ যাইয়া তাহার চরণে নুইয়া পড়িত। এক 
অনির্ববচনীয় স্িগ্ধোজ্বল দীপ্তি হরিদাস ঠাকুরের অঙ্গে সতত 
বিরাজ করিত। তাহাকে দেখিয়া যে শত শত লোকে ভক্তি 
করিবে, ইহা! আর বিচিত্র কি ? সর্ব্বোপরি তীহার ফ্ষমল-নয়নের 
স্রেহ-দৃষ্টি ও কটনিঃস্থত মধুমাখা হরিনাম সকণে তব চিত্ত-বিত্ত 


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ১১ 


হরণ করিয়া লইত। হরিদাসঠাকুর সর্বদাই হরিনাম-রসে 
ভরপুর হইয়া থাকিতেন, এ নিমিত্ত সহজ কণ্টের প্রশংসা-স্তুতিবাদ 
তাহাকে স্পর্শও করিতে পারিত না । তিনি ঠাকুরালি জাঁনিতেন 
না, করিতেনও না। কিন্তু ঠাকুরের ন্যায় পূজা! পাইতে 
লাগিলেন । 


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ 
বেণাপোলে-_-ভক্তের বীরত্ব 


বনগ্রাম প্রদেশের তদানীন্তন ভূম্যধিকারী ছিলেন রাজা 
রামচন্দ্র খান। নবাবী আমলে বঙ্গীয় হিন্দুগণ ঠাকুরতা, 
দত্তিদ/র, মজুমদার, খাসনবিশ, মহলানবিশ প্রভৃতি মুসলমানী 
উপাধি লাভ করিয়া! আপনাদিগকে সম্মানিত জ্ঞান করিতেন । 
ধনে মানে যাহারা একটু বড়, এইরূপ জমিদারগণ খান প্রভৃতি 
উপাধি পাইতেন। কিন্তু আপন আপন জমিদারীমধ্যে তাহারা 
রাজ! বলিয়াই পরিচিত হইতেন। রামচন্দ্র খান শক্তির উপাসক 
ও জাতিতে ব্রাহ্ষণ। দুর্দান্ত জমিদার বলিলে যাহা বুঝায়, 
তিনি তাহাই ছিলেন । 

হরিদাস ঠাকুরের প্রভাবের কথা এত দিনে বনগ্রামের 
ছোট বড় সকলেই অবগত হইয়াছে । ধাঁহাদের একটু স্বাভাবিক 
ধন্ম-মতি আছে, 'তাহারা৷ দলে দলে যাইয়া তাহাকে দেখিয়া 


১২ ঠাকুর হরিদাস 


আসিতেছেন, আসিয়া শত মুখে তাহার গুণকীর্তন করিতেছেন । 
আর ধাঁহাদের মতি-গতি অন্যপ্রকার, তাহার! হরিজাস ঠাকুরের 
কথ! লইয়! পথে ঘাটে তর্কবিতর্ক ও সমালোচনার ড় বহাইয়া 
দিতেছেন। হরিদাস ঠাকুরের অপরাধ যে, তিনি জাতিতে যবন 
হইয়া কেন হিন্দুর হরিনাম করেন, আর হিন্দুর! যাইয়া কেন 
তাহাকে ভক্তি করে? জমিদার রামচন্দ্র সমস্ত শুনিয়া চিত্তে 
স্থির থাকিতে পারিলেন না। যবন হইয়! হিন্দুর হরিনাম 
গ্রহণ ? আর হিন্দুর উপর ঠাকুরালি ? প্রবল পরাক্রান্ত রামচন্দ্র 
কি ইহ সহিতে পারেন ? না, কখনই নহে। যে প্রকারেই 
হউক, যবনকে জব্দ করিতেই হইবে, ইহাই খানের প্রতিজ্ঞা । 

যেমন রাজা, তেমন তীর মন্ত্রী, আর তেমন তার মন্ত্রণা-সভা! | 
মন্ত্রণায় পারিষদগণ রামচন্দ্রের প্রতি কথায়ই সায় দিলেন এবং 
অতি উত্তম বলিয়া প্রশংসা করিলেন। মন্ত্রণার চুড়ান্ত হইয়া 
গেল। রামচন্দ্র খান তাহার এলাকার কয়েকটী বেশ্যাকে 
ডাকাইয়া আনিয়া আদেশ করিলেন-_-“তোমাদের মধ্যে যে কেহ 
যাইয়া হরিদাসের ধন্মনষ করিয়া আসিতে পারিবে, সে বনু অর্থ 
ও বিত্ত পুরস্কার পাইবে । অগ্তই ইহা করিতে হইবে ।” 


*কোন প্রকারে হরিদাসের ছিদ্রে নাহি পায়, 
বেশ্তাগণ আনি করে ছিদ্রের উপায়। 
বেশ্তাগণে কনকে--এই বৈরাগী হরিদাস, 
তুমি সব কর ইহার বৈরাগা-ধন্ম নাশ ।” 
(শ্রী চৈঃ চঃ) 


ছিতীয় পরিচ্ছেদ ১৩ 


বেশ্যারাও ইতিপূর্ব্বেই হরিদাস ঠাকুরের মহিমার কথা 
শুনিয়াছিল। বেশ্যা! হইলে কি হয়? বেশ্যাদের মধ্যেও এমন 
আছে, যাহারা ঠাকুর-দেবতা মানে এবং প্রকৃত সাধুর বিরাগ 
উত্পাদন করিতে ভয় পায়। তাই জমিদারের এই রূপ আজঙ্ঞ! 
শুনিয়াও তাহাদের মধ্যে প্রায় সকলেই নীরব হইয়া রহিল। কিন্তু 
রূপ-যৌবনের বিশেষ গর্বৰ রাখে, এমন এক হতভাগিনী উৎসাহের 
সহিত এই প্রস্তাবে সম্মত হইল এবং গর্বব করিয়া বলিল-_ 
“মহারাজ! যদি আজ্ঞা হয়, তবে আমি যাইয়া তিন দিনের মধ্যেই 
তাহাকে মোহিত করিয়া আসিব, এই প্রতিজ্ঞা করিতেছি ।৮ 


“বেশ্টাগণ মধ্যে এক সুন্দরী যুবতী, 
সেই কে তিন দিনে হবিব তার মতি ।” 


(শ্রী চৈঃ চঃ) 


স্পা পাত শপ সাপ শপ লপ্াা াপ সনাগা শপ 


* এই বেগ্তাটী সম্বন্ধে “ঘশোহর খুলনার ইতিহাস” লেখক শ্রীযুক্ত সতীশচন্্র 
মিত্র মহাশয় বলেন--“তিনি (রাষচত্র থান ) বেশ্টাসক্ত হীনচরিত্র ছিলেন। 
স্তাহার একী বেশ্যার নাম হীর1। ছুবৃত্ত জমিদারের বিপুল অর্থ আকর্ষণ করিয়। 
হীর! লক্ষ মুত্রা সঞ্চয় করিয়াছিল; তাই লোকে বলে, তার জন্য তাহার নাম 
হইয়াছিল "লক্ষহীরা। হরিদাসের সর্বনাশ সাধন জন্য রামচন্দ্র এই লক্ষহীয়াকে 
নিযুক্ত করেন। * গগ গ কাগজ পুকুরীয়খর সন্নিকটে গয়ড়া-রাজাপুরে 
হীরার জন্য একটী বাটী প্রস্তুত হুইয়াছিল। রামচন্দ্র মমুরপত্থী তরণীতে চড়িয়া 
যে পথে হীরার বাড়ী যাতায়াত করিতেন, সে পথে খালের চিহ্ন এখনও আছে। 
রাজাপুর এক্ষণে লোকশুন্ প্রান্তর হইয়া গিয়াছে। সেখানে হীক্নার তিষ্টার 
ইষ্টকাদি ভগ্রাবশেষ এবং *বীরার পুকুরের” খাত এখনও সেই প্রাচীনকালের লাক্ষ্য 
দিতেছে । কাগজপুকুরিয়াও গয়ড়া-রাজাপুক বেপাপোল হইতে দেড় যাইলকি 
€ুই মাইল ব্যদধানে অবস্থিত |” 











১৪ ঠাকুর হরিদাস 


তিন দিনের কথাটা রামচন্দ্রের ভাল লাগিল না। তীহার 
ইচ্ছা যে, তিনি এ মুহূর্তেই হরিদাসকে একটা [দুশ্চরিত্র তগু 
প্রমাণ করিয়া তাহাকে উত্তমরূপ শিক্ষা দেন। তাই-_ 


“থান কনে মোর পাইক যাউক তোমার সনে, 
তোমার সহিত একত্র তারে ধরি ষেন আনে ৮ 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 


কিন্তু উক্ত রমণী প্রথমেই একবারে পাইক বরকন্দাজ লইয়। 
যাওয়াটা পছন্দ করিল না । 


“বেস্তা কহে মোর সঙ্গ হোক একবার , 
দ্বিতীয় বারে ধরিতে পাইক লইব তোমার |” 


সেই দিনই অর্থলুব্ধ! বারবিলাসিনী অপুর্বব বেশভূষা করিয়া 
রাত্রিকালে হরিদাস ঠাকুরের স্থানে যাঁইয়। উপস্থিত হইল। 
আগে তুলসী-তলায় নমস্কার করিল, তার পর হরিদাসঠাকুরকে 
নমস্কীর করিয়! কুটারের দুয়ারে দাঁড়াইয়া রহিল । 


তুলসী নমস্করি হরিদাসের দ্বারে যাঞা, 
গোসাঞ্চিরে নমস্করি রহিল! দাগ্ডাইয়া ।” 
(শ্রী চৈঃ চঃ) 


এই সময়ে হরিদাসঠাকুরের বয়স অনধিক ত্রিশ বুসর। 
সবল, স্ুবলিত, পরম শ্রীমান যুবক । কিন্তু যৌবনের চাঞ্চল্য 
তীহাতে ছিল না। সর্ববদ! কৃষ্ণপ্রেমে কৃষ্ণনাম-রসে মাতোয়ারা 


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ১৫ 


হইয়া তিনি সরস যৌবন-কাল সফল করিতেছিলেন। তখন 
হরিদাস ঠাকুর__ 
“বিষয়-ম্ুখেতে বিরক্কের অগ্রগণা, 
কৃষ্ণ নামে পরিপূর্ণ শ্রীবদন ধন্। 
ক্ষণেক গোবিন্দ নামে নাহিক বিরতি) 
ভক্কি-রসে অন্ুক্ষণ হয় নানামুত্তি ৷” 
(শ্রীচৈঃ চঃ) . 


হরিদাস ঠাকুরের রূপ দেখিয়। বেশ্যা চমকিয়া উঠিল। 
তাহাকে মুগ্ধ করিতে আসিয়া সে নিজেই চিত্তে মোহিত হইল । 
রামচন্দ্রের প্রতিশ্রুত অর্থের কথা যেন সে মুহূর্তের জন্য ভুলিয়া 
গেল। এমন স্থন্দর ঠাকুরের প্রণয়-লালসাই বুঝিবা এক্ষণে 
যুবতীর চিত্ত অধিকার করিয়া বসিল। কি অপুর্ব রূপ! কি 
মধুর গম্ভীর কণ্টস্বর ! হাজার বক্রুবুদ্ধি হউক না কেন, বেশ্যার 
প্রাণে ঠাকুরের প্রতি প্রথম দর্শনেই একটা আকর্ষণ জম্মিল। 
ঠাকুর হরিদাস স্থিরাসনে বসিয়া অবিশ্রান্ত নাম করিতেছেন__ 
তক্তি-বিগলিত-কণ্টে মধুর মধুর হরিনাম করিতেছেন । নাম 
করিতে করিতে একবার রমণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করিবামাত্রই 
তিনি তাহার হৃদয়ের অস্তস্তল নখদর্পণের ন্যায় দেখিয়া লইলেন। 
আমরা মানুষের বাহির দেখিয়াই ভাল মন্দ একটা বুঝিয়া 
লই এবং অনেক সময়েই ভুল বুঝিয়া লই। কিন্তু "তত্বদর্শী 
সাধু-মহাপুরুষেরা জীবের অস্তঃপ্রকৃতি দেখিয়া ভাল-মন্দের 
বিচার করিয়া থাকেন । ঠাকুর হরিদাস দেখিলেন যে, প্রবৃত্তির 


১৬ ঠাকুর হরিদাস 


বশে অবস্থার অধীন হইয়া এই রমণীর চরিত্র বেশ্যা-চরিত্র 
হইলেও ইহার হৃদয়ে ইহার অস্তঃপ্রকৃতিতে ভাল জিনিস 
আছে। ঠাকুর মনে মনে রমণীকে আশীর্ববাদ করিলেন । 

ঠাকুর হরিদাস পরম সুন্দর পুরুষ বটেন, কিন্তু তাহার 
আকর্ণ নয়নের স্সেহ-সিক্ত দৃষ্টি আরও সুন্দর, আরও মধুর ছিল। 
তাহার চক্ষে চক্ষু পড়িলে বুঝিবা ক্রুর সর্পও মুগ্ধ হইত। হরিদাস 
একবার মাত্র বেশ্যাটির পানে চাহিতেই, সেই ছলাকলা-পরায়ণা 
মুগ্ধা কামিনী খোলাখুলি বলিয়া ফেলিল-_ 


“ঠাকুর তুমি পরম সুন্দর প্রথম যৌবন, 
তোমা দেখি কোন না'রী ধরিতে পারে মন? 
তোমার সঙ্গ লাগি লুব্ধ মোর মন, 
তোম1 ন! পাইলে প্রাণ না যায় ধারণ।» 
( শ্রী চৈ: চঃ) 
হরিদাস ঠাকুর তখন কি উত্তর করিলেন ?-_ 
“হরিদাস কনে তোমায় করিব অঙ্গীকার, 
সংখ্য! নাম সমাপ্তি যাবং আমার, 
তাবৎ তুমি বসি শুন নাম সংকীর্তবন, 
নাম সমাপ্তি হৈলে করিব যে তোমার মন» 
(শ্রী চৈঃ চঃ) 


এস্থলে “তোমায় করিব অঙ্গীকার” এবং “করিব, যে 
তোমার মন,» এই দুইটা উক্তির বিশেষ তাৎপর্য্য আছে, পরে 
তাহ। প্রকাশ পাইবে । 


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ১৭ 


সেই নারী প্রাণে আশ! লইয়া দুয়ারে বসিয়া রহিল। 
হরিদাস ঠাকুর উচ্চ কে হরিনাম করিতেছেন, আর সে হত- 
ভাগিনী--হতভাগিনী বলিতে ইচ্ছা হয় না বসিয়া বসিয়। তাহা 
শুনিতেছে এবং ঠাকুরের রূপ দেখিতেছে। কেবল ভাবিতেছে, 
কতক্ষণে তাহার নামসংখ্যা পুর্ণ হইবে। এই রূপে রাত্রি 
কাটিয়া! গেল, প্রভাত হইল । প্রাতঃকাল দেখিয়া রমণী নিরাশ 
প্রাণে উঠিয়া চলিয়া গেল এবং রামচন্দ্র খানের নিকট যাইয়া, 
সমস্ত বৃত্তীস্ত নিবেদন করিল। 

সেই বেশ্যা যাইয়া রামচন্দ্রকে আশ্বাস দিয় বলিল ষে, 
ঠাকুর তাহাকে গ্রহণ করিবেন বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছেন । 
সুতরাং তাহাকে বশ করিয়া ফেলিতে আর বেগ পাইতে হইবে 
না। ইহা ত জানা কথা। রামচন্দ্র বুঝিলেন যে, ওষধে 
ধরিয়াছে। তাই বেশ্যাকে আবার অগ্ভ রাত্রে অধিকতর উৎসাহের 
সহিত পাঠাইয়। দ্িলেন। রমণী আজিও আসিয়া প্রথমে তুলসী 
নমক্কার করিল, পরে ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া কুটারের দ্বারে 
বলিয়া নাম শুনিতে লাগিল। হরিনামের একটা শক্তি আছে। 
তাহা আবার হরিদাস ঠাকুরের ভক্তিমাখা শক্তিমাখা স্থমধুর 
কে উচ্চারিত হইতেছে । হরিনাম শ্রবণের একটা ফল আছেই 
আছে । কাল সার! রাত জাগিয়া বেশ্যাটী নাম শুনিয়াছে। আজ 
হরিনাম তাহার বড়ই মিষ্ট লাগিল। তাই সে বসিয়া বসিয়। 
যেমন নাম-কীর্তন শুনিতেছে, তেমনি নিজেও মাঝে মাঝে 
হরেকৃঞ্ণ হরেকৃঞ্ বলিতেছে। 


১৮ ঠাকুর হরিদাস 


মুখে হরি হরি বলিলে কি হইবে? রমণীর হৃদয়ে যে 
ভুর্ববার বাসনানল ভ্বলিতেছে, তাহাতে সে সোয়ান্তি। পাইতেছে 
না। হুরিনামাম্ৃত-রস বখন কানের ভিতর দিয়া তাহার মরমে 
পশিবে, তখন নিশ্চয়ই এই হদ্রোগ--এই জ্বাল! নির্ববাপিত 
হুইবে। কিন্তু তৎপূর্বে নয়। আজিও দেখিতে দেখিতে রাত্রি 
প্রায় শেষ হইয়া আসিল । ঠাকুরের কীর্তন শেষ হইতেছে ন৷ 
দেখিয়া, বেশ্যা উধি-পুধি করিতে লাগিল। 

“রাত্রি শেষ হৈল বেশ্ঠা উষি-পুষি করে ।” 

বেশ্যাটীর অবস্থা। দেখিয়া ঠাকুর হুরিদাসের প্রাণ দয়ায় গলিল। 
তিনি তাহাকে বলিলেন, “দেখ, এক মাসে এক কোটী নাম 
জপ করা আমার ব্রত। তাহা প্রায় সম্পূর্ণ হইয়া আসিল । 
আমি ভাবিয়াছিলাম যে, অগ্ভ রজনীতেই এক কোটা সংখ্যা 
সমাপ্ত করিতে পারিব। কিন্তু তাহা হইল না, তাই তোমার 
সহিত আলাপ করিবার স্থযোগ ঘটে নাই। কল্য সংক্রান্তি। 
কল্যই ব্রত সমাপ্ত করিতে পারিব। তুমি এজন্য মনে ছুঃখ 
করিও না। আবার আসিও।” হরিদাস ঠাকুরের মুখে এই 
প্রকার স্সেহপুর্ণ বাক্য শুনিয়া বেশ্যার নিরাশ প্রাণে আশার 
আলোক ফুটিল। রমণীহৃদয়ের কোমলতম স্থানে যাইয়া একটা 
কোমল আঘাত পড়িল, সে ঠাকুরকে প্রাণে প্রাণে ভালবামিল। 

বেশ্থাটী সর্ববপ্রথমে রামচন্দ্র খানের প্রতিশ্রুত অর্থের 
লোভেই আসিয়াছিল। মায়ামমতা বলিয়া যে একটা জিনিষ, 
তাহ বেশ্যাদের প্রাণে প্রায়ই থাকে না। তাহার প্রাণেও উহা 


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ বর 


বড় একটা ছিল না। হরিদাসকে ুক্ছ্রিয়া ণ রাত জাগিয়! 
করিয়া, রামচন্দ্র তাহাকে শুলেই চড়ান, কি জ। বীয় মহিমা । 
পোড়ান, তাহাতে তাহার কি আসে যায়? তাহার শত করিতে 
হইল। অর্থের লালসাতেই সে একাধ্যে প্রবৃত্ত হ- হইয়াছে, 
ইহার সঙ্গে আর একটা ব্যাপারও ছিল। উহা তাহ।বনামে 
যৌবনের স্পদ্ধা। যাহার গায়ে একটু বেশী জোর আছেণনে 
ব্যক্তি কথায় কথায় যার তার সঙ্গে লড়িতে যায়, এবং কাহাক্'র 
বলে পরাস্ত করিতে পারিলে, মনে মনে একট গর্বব অনুভব 
করিয়া থাকে । সেইরূপ যৌবন-গর্বেব গর্বিবিতা চরিত্রহীনারাও, 
বুঝিবা কটাক্ষে ব্রহ্মাণ্ড জয় করিতে পারে, মনে মনে এরূপ 
একট। স্পদ্ধ। রাখে । 

আজ কিন্তু বেশ্যাটার মনের ভাব অন্য রূপ। সে হরিদাস 
ঠাকুরের রূপে-_ শুধু রূপে নয়, গুণেও মুগ্ধ হইয়াছে । স্ৃতরাং 
রামচন্দ্র খানের হাতে ঠাকুরকে ধরাইয়া দিবার কথা কি আর 
সে ভাবিতে পারে? তথাপি খবরটা তাহাকে না জানাইলে 
নয়, তাই সে রামচন্দড্রের কাছে যাইয়া এই রাত্রের বুত্তাস্ত সমস্ত 
বলিল। কিন্ত মনে মনে বোধ হয় বলিতেছিল যে, যদি আজ 
ঠাকুরের কৃপা হয়, তবে সে আর গৃহে ফিরিবে না। 

রমণী আজ গৃহে যাইয়া সারাদিন কেবল হরিদাস ঠাকুরের 
কথাই ভাবিল। আজ ঠাকুরের সমস্তই সে স্থন্দর দেখিতেছে। 
হুরিদাসের ললাটে তিলক, কণ্টে তুলসীর মালা ও রসনায় 
স্থধামাথা হরিনাম, এ সমস্তই তাহার নিকট বড় সুন্দর--বড় 


ঠাকুর হরিদাস 


মুখে হরি হরি বলিলে কি হইবে? রমণীর হৃদয়ে যে 
দুর্ববার বাসনানল জবলিতেছে, তাহাতে সে সোয়ান্তি পাইতেছে 
না। হরিনামামৃত-রস যখন কানের ভিতর দিয়া তাহার মরমে 
পশিবে, তখন নিশ্চয়ই এই হদ্রোগ--এই জ্বালা নির্ববাপিত 
হইবে। কিন্তু তৎপুর্বেব নয় । আজিও দেখিতে দেখিতে রাত্রি 
প্রায় শেষ হইয়া আমিল। ঠাকুরের কীর্তন শেষ হইতেছে না 
দেখিয়া, বেশ্যা উধি-পুধি করিতে লাগিল। 

“রাত্রি শেষ হৈল বেশ্ঠা! উষি-পুধি করে ।” 

বেশ্াটার অবস্থা দেখিয়া! ঠাকুর হরিদাসের প্রাণ দয়ায় গলিল। 
তিনি তাহাকে বলিলেন, “দেখ, এক মামে এক কোটী নাম 
জপ করা আমার ব্রত। তাহ! প্রায় সম্পূর্ণ হইয়া আসিল। 
আমি ভাবিয়াছিলাম যে, অগ্ক রজনীতেই এক কোটা সংখ্যা 
সমাপ্ত করিতে পারিব। কিন্তু তাহা হইল না, তাই তোমার 
সহিত আলাপ করিবার স্থযোগ ঘটে নাই। কল্য সংক্রান্তি। 
কল্যই ব্রত সমাপ্ত করিতে পারিব। তুমি এজন্য মনে দুঃখ 
করিও না। আবার আসিও।” হরিদাস ঠাকুরের মুখে এই 
প্রকার স্সেহপুর্ণ বাক্য শুনিয়া বেশ্যার নিরাশ প্রাণে আশার 
আলোক ফুটিল। রমণীহদয়ের কোমলতম স্থানে যাইয়া একটা 
কোমল আঘাত পড়িল, সে ঠাকুরকে প্রাণে প্রাণে ভালবাসিল। 

বেশ্মাটা সর্ববপ্রথমে রামচন্দ্র খানের প্রতিশ্রুত অর্থের 
লোভেই আসিয়াছিল। মায়ামমতা বলিয়া যে একটা জিনিষ, 
তাহ! বেশ্টাদের প্রাণে প্রায়ই থাকে না। তাহার প্রাণেও উহা 


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ্ 


বড় একটা ছিল না। হরিদাসকে দুক্ছ্িয়া ণ রাত জাগিয়া 
করিয়া, রামচন্দ্র তাহাকে শুলেই চড়ান, কি জসীয় মহিমা | 
পোড়ান, তাহাতে তাহার কি আসে যায়? তাহারত্ত করিতে 
হইল। অর্থের লালসাতেই সে একাধ্যে প্রবৃত্ত হ-হইয়াছে, 
ইহার সঙ্গে আর একট! ব্যাপারও ছিল। উহ৷ তাহ।বনামে 
যৌবনের স্পর্ধা । যাহার গায়ে একটু বেশী জোর আছেণনে 
ব্যক্তি কথায় কথায় যার তার সঙ্গে লড়িতে যায়, এবং কাহাক্-র 
বলে পরাস্ত করিতে পারিলে, মনে মনে একটা গর্ব অনুভব 
করিয়া থাকে । সেইরূপ যৌবন-গর্বেব গর্বিত চরিত্রহীনারাও, 
বুঝিবা কটাক্ষে ব্রহ্মাণ্ড জয় করিতে পারে, মনে মনে এরূপ 
একটা স্পদ্ধ। রাখে । 

আজ কিন্ত্ত বেশ্টাটার মনের ভাব অন্য রূপ। সে হরিদাস 
ঠাকুরের রূপে--শুধু রূপে নয়, গুণেও মুগ্ধ হইয়াছে। স্থৃতরাং 
রামচন্দ্র খানের হাতে ঠাকুরকে ধরাইয়া দিবার কথা কি আর 
সে ভাবিতে পারে ? তথাপি খবরটা তাহাকে না জানাইলে 
নয়, তাই সে রামচন্দ্রের কাছে যাইয়া এই রাত্রের বৃত্তাস্ত সমস্ত 
বলিল। কিন্তু মনে মনে বোঁধ হয় বলিতেছিল যে, যদি আজ 
ঠাকুরের কৃপা হয়, তবে সে আর গৃহে ফিরিবে না । 

রমণী আজ গৃহে যাইয়া সারাদিন কেবল হরিদাস ঠাকুরের 
কথাই ভাবিল। আজ ঠাকুরের সমস্তই সে স্থন্দর দেখিতেছে । 
হরিদাসের ললাটে তিলক, কণ্টে ভুলসীর মালা ও রসনায় 
স্থধামাথা হরিনাম, এ সমস্তই তাহার নিকট বড় স্থন্দর-_-বড় 


নও 
মধুর জ্ঞান হইতে: 
চিলাচিনগ লাগিল। আজ সন্ধ্যাকালে যুবতী আপনাকে 
নত জে সাজাইল-_-গলে তুলসীর মালা পরিল, ভালে 
গোপীচন্দনে 
রর তিলক রচনা করিল এবং সর্ববাঙ্গে হরিনাম 
লিখিল। 
এইরূপে হরিদাসী সাজিয়া মুখে হরিমাম করিতে 
'হরিদ[সের স্থানে আসিয়া! উপস্থিত হইল । 


ঠাকুর হরিদাস 


“পর দিন গলে দিয়া তুলসীর মাল, 
গোগী চন্দন দিয়া ভালে তিলক রচিলা । 
অঙ্গে হরিনাম লিখি বৈষ্ণবী সাজিলা, 
তবে সন্ধ্যাকালে হরিদাস স্থানে আইল! 1৮ 
( শ্ীঅদ্বৈত-প্রকাশ ) 
আসিয়া সেই নারী পূর্বেব ন্যায় তুলসী ও ঠাকুরকে নমস্কার 
করিয়া কুটীরের দুয়ারে যাইয়া বসিল। হরিদাস একান্ত মনে 
হরিনাম করিতেছেন । বসিয়া বসিয়া বেশ্যাও মাঝে মাঝে 
হরেক নাম উচ্চারণ করিতে লাগিল। কাখণ হরিনাম তাহার 
বড় ভাল লাগিয়াছিল। তাহ ছাড়া হরিদাস ঠাকুরের মন 
পাইবার নিমিত্ত একটু ছলনাও ছিল। 
“বৃন্দ নমস্করি বসি কুটার দ্রয়ারে, 
ছলে বেশ্ঠা হার হরি কহে উচ্চৈঃশ্বরে |” 
(শ্রীঅঃ প্রঃ) 
অন্য মাসের সংক্রান্তি। অগ্ই ঠাকুর হরিদাসের কোটা 
নাম-জপ পুর্ণ হইবে । সেই নারীর বাসনাও বুঝি আজ অপূর্ণ 
থাকিবে না। নামসংকীর্তনে নিশি প্রায় অবসান হইয়াছে। 


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ২১ 


আজ বেশ্যাটীও হরিদাস ঠাকুরের সঙ্গে সঙ্গে সারা রাত জাগিয়। 
হরিনাম করিয়াছে । সাধুসঙ্গের কি অচিন্তনীয় মহিমা ! 
হরিনামের কি অপ্রতিহত প্রভাব! হরিনাম করিতে করিতে 
আজ সেই রমণী কখনও রোমাঞ্চিত, কখনও অশ্রুসিক্ত হইয়াছে, 
কখনও ব1 প্রাণের আবেগে অস্থির হইয়। কীদিয়াছে। হরিনামে 
যে এত শক্তি, এত রস, এত মাধুরী, তাহা.ত সে আগে জানে 
নাই। বেশ্যা মার আজ বেশ্যা নাই। জগন্মঙ্গল হরিনামের 
অম্বত-রস হৃদয়ে পশিয়! আজ তাহার সমস্ত চিত্ত-বৃত্তি নিম্মল 
করিয়া দিয়াছে! আর বেশ্যা বলিও না-যদি চক্ষু থাকে, 
চাহিয়া দেখ-_দেবী ! 

রমণী কি বাসনা হৃদয়ে লইয়! হরিদাস ঠাকুরের নিকট 
আসিয়াছিল, আর দেখ, আজ তাহার প্রাণের অবস্থা কি! 
সূর্যোদয়ে অন্ধকার-বিনাশের ন্যায় সেই ছার অর্থের প্রলোভন, 
সেই রূপের লালসা, সেই নীচ স্থুখের কামনা, আজ তাহার 
হৃদয় হইতে কোথায় অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে! আজ সেচায় 
ভক্তি, সে চায় মুক্তি ! “ঠাকুর! কৃপা কর, কুপা কর; পাপায়সী 
নারকী আমি; রামচন্দ্রের প্রেরিতা পিশাচিনী আমি ঠাকুর । 
গুরুদেব! কৃপা কর, ক্ষমা কর, মুক্তি দাও, ভক্তি দাও” 
বলিয়া অনুতপ্তা নারী হরিদাস ঠাকুরের চরণতলে পড়িয়৷ 
কাদিয়া লোটাইতে লাগিল। 

“্দগুবৎ হৈয়া পড়ে ঠাকুর-চরণে 
রামচন্দ্র খানের কথ! কৈল নিবেদনে । 


২২ ঠাকুর হরিদাস 


বেশ্তা হৈয়া মুঞ্ি পাপ করিয়াছি অপাঁর|। 
কূপ! করি কর মুগ অধমে নিস্তার |” 


( শ্রীচৈঃ চঃ) 
“হরিদাসে প্রণমিয়া কহে যোড় করে, 
তুঁহু চুম্বক মহামণি আকধিলা মোরে। 
তুঁছু প্রভূ গুরু দয়াময় কল্পবৃক্ষ, 
মোক্ষফল দেহ মোরে হইয়া সপক্ষ |” 
(শ্রী অঃ প্রঃ) 


সেই শুভ সংক্রান্তির দিনে,_সেই রাত্রি-দিনের শুভ 
সন্ধিক্ষণে--ঠাকুর হরিদাস রমণীর “মনের বাসনা” পুর্ণ করিলেন, 
তাহাকে “অঙ্গীকার করিলেন--হরিনাম-প্রদানে তাহাকে কৃতার্থ 
করিলেন । 

“হরিনাম দিল! কর্ণে শক্তি সঞ্চারিয়1 1” 
(শ্রী অঃ প্রঃ ) 

অতঃপর হরিদাস কহিলেন, “আমি খানের ছুরভিসন্ধি 
পূর্ব্বেই বুঝিতে পারিয়াছিলাম। সে নিতান্ত অন্ত, মূর্খ, সেজন্য 
তাহার আচরণে আমর ছুঃখ নাই। তুমি যখন প্রথম দিন 
এখানে আসিয়াছিলে, সেই মুহূর্তেই আমি এস্থান ছাড়িয়া চলিয়া 
যাইতাম। এই তিন দিন এখানে রহিয়াছি--কেবল তোমাকে 
নাম দিবার নিমিত্ত 1৮ 

অভাগিনীর কি ভাগ্য! কিসের লাগিয়া আসিয়াছিল, আর 
আসিয়া কি পরম বস্তু লাভ করিল! হরি! হরি! সে চক্ষের 


২৫ 


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ 
কথ! ..। কীদিতে কীদিতে বলিল, “ঠাকুর! চে হইয়াছিল, 


॥ 
[কি গুণে যে আমার মত হতভাগিনীকে তুমি কৃপা 
র, 
তুমিই জান ঠাকুর। প্রভো ! তুমি নিজগুণে কৃপা 
স্ব যে পরম বস্তু দান করিয়াছ, কেমন করিয়া আমি 
রঙ্্রব ? এক্ষণে আমার কর্তব্য কি? বলিয়া দাও । 
বটে মধুর, বড়ই মধুর। কিন্তু ঠাকুর! প্রাণে বড় 
দবান্নকসে জ্বাল! যায়, কেমন করিয়া আমি হরিনাম-রসে 
পারিব, তাহার সন্ধান আমায় বলিয়া দাও 1৮ 
টরাকুর হরিদাস বলিলেন, “বাছা ! আর ভয় নাই। তোমার 
 রব্জাত ব্রাহ্মণকে দান করিয়া! আমার এই কুটারে 
পলা তুমি নিরন্তর ভজন কর, আর তর হয়। ' শাক 
( এচেঃ চ2) 
[তি অচিরেই শ্রীগোবিন্দের চ 
রঃ ব।” 










“ঠাকুর কহে 
এই ঘ” তৃতীয় পরিচ্ছেদ 
চাদপুরে 

£ সাধু তক্ত মহাপুরুষের এই সংসারের কিছুতেই আবদ্ধব- 
। কোনও ব্যক্তি, বস্তু বা স্থান তাহাদিগকে বাঁধিয়া রাখিতে 
র না। তীহার। বাঁধা পড়িয়াছেন--কেবল ভগবানের এ রাঙ্গা 
ণ। কেবল মাত্র ভগবদিচ্ছারই প্রেরণায় তাহারা মুক্তা- 
(কাশের বিহঙ্গের ন্যায় ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিয়া থাকেন। 







২৬ ঠাকুর হরিদাস 
আমাদের ঠাকুর হরিদাস তাহার সেই অভিপ্রিয় ভজন-স্থল 


বেণাপোলের জঙ্গল পরিত্যাগ করিয়া ভ্রমণ করিতে করিতে 
টাদপুরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং উজ আচার্য 
নামক এক সম্ত্রান্ত ব্রাহ্মণের গৃহে যাইয়া আশ্রয় লইলেন | 
“হরিদাস ঠাকুর চলি আইল! টাদপুরে, 
আসি রহিল বলরাম আচাধ্যের ঘরে |” 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 
এই চাদপুর স্থৃপ্রসিদ্ধ সপ্তগ্রামের সন্নিকটবর্তী একটা ক্ষুদ্র 
গ্রাম। সপ্তগ্রাম বর্তমান হুগলী হইতে বেশী দুরে নয়। 
বাদশাহি আমলে এ স্থানে সাতটি বড় বড় গ্রাম লইয়া একটি 
সমৃদ্ধিশালী নগরের পত্তন হইয়াছিল। এ নিমিত্ত উহা সপ্তগ্রাম 
নামে প্রসিদ্ধ। চলিত কথায় উহার নাম সাতর্গা। উহা 
পুরাতন সরস্বতী নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। এক্ষণে সেই 
ত্োতস্বিনীর শআ্োতঃ শুকাইয়া লোকলোচনের অদৃশ্য হইয়াছে । 
তণকালে মজুমদার উপাধিধারী স্বনামধন্য হিরণ্য দাস ও 
গোবর্ধন দাস দুই সহোদর সপ্তগ্রামের ভূম্যধিকারী ছিলেন। 
তহিরণ্য জ্যে্, গোব্দ্ধন কনিষ্ঠ, জাতিতে কায়স্থ। তীহারা 
এপপ্তগ্রামে থাকিয়া গৌড়ের বাদশাহ হোসেন সাহার প্রতিনিধি 
কর্ম্মচারীরূপে রাজকাধ্যে নিযুক্ত ছিলেন । তীহাদিগের জমি- 
দারির াধিক উপস্বত্ব ছিল বার লক্ষ টাকা। 
বলরাম আচাধ্য হিরণ্য-গোবদ্ধনের কুল-পুরোহিত। আচার্য 
শান্ত দাস্ত সদ্ত্রান্ষণ ও স্পগ্ডিত। বিশেষতঃ; ভক্তিশান্ত্রে 


তৃতীয় পরিচ্ছেদ ২৭ 


তাহার অসাধারণ অধিকার ছিল। এই কারণে সদাচারপরায়ণ 
হিরণ্য-গোবদ্ধন ছুই সহোদরের নিকট তীহার বিশেষ প্রভাব- 
প্রতিপত্তি ছিল। ঠাকুর হরিদাসের আগমনে বলরাম আচার্য 
ষেন হাতে স্বর্গ পাইলেন। ঠাকুরের নাম পূর্বেই শুনিয়াছিলেন। 
তাহাকে দেখিবার জন্য, তাহার পবিত্র সঙ্গ পাইবার নিমিত্ত, 
আচাধ্যের প্রাণে বহুদিন হইতেই একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা! ছিল। 
সেই হরিদাস ঠাকুর আজ আপন! হইতেই আসিয়া অতিথিরূপে 
অকল্মাৎ তাহার গৃহে উপস্থিত। ইহাতে আচার্যের আনন্দের 
অবধি রহিল না। বলরাম পরমাদরে ঠাকুরের পরিচধ্যায় 
নিযুক্ত হইলেন এবং একটি নির্জন পর্ণশালায় তাহার ভজনের 
স্থান নির্দেশ করিয়া দ্িলেন। ঠাকুর তথায় থাকিয়া আপন 
মনে দিবারাত্রি নাম কীর্তন করিতে লাগিলেন । 

কবিরাজ গোস্বামী বলরাম আছচাধ্যকে “হরিদাসের কৃপা- 
পাত্র” বলিয়াছেন। ইহাতে নিশ্চয় বুঝ! যাইতেছে যে, বলরাম 
আচার্য্য ঠাকুর হরিদাসের স্থানে মন্ত্রদীক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন । 

হিরণ্য-গোবদ্ধন ছুই ভাই হরিদাস ঠাকুরের বৈরাগ্য, কঠোর 
নাধনা ও প্রেম-চেষ্টার কথা পুর্বেবেই অবগত ছিলেন । এক্ষণে 
পুরোহিত বলরাম আচাষ্যের মুখে তাহার টাদপুরে আগমন- 
প্রসঙ্গে সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া উভয়ে ঠাকুরের দর্শনার্থ লালায়িত 
হইলেন। হিরণ্য দাস ও গোবদ্ধন দাস পরম বৈষ্ণব ।' উভয়েই 
বিষ্তোত্সাহী ও শান্ত্রানুরাগী ছিলেন। তাহার্দের সভায় নিত্য 
মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতগণ উপস্থিত থাকিয়া শান্তর চচ্চা 


২৮ ঠাকুর হরিদাস 


করিতেন। আপনারাও দুই ভাই শাস্ত্রে স্ুপপ্ডিত ছিলেন। 
তাহার! আচাধ্যের মুখে হরিদাস ঠাকুরকে একান্ত মিনতি.করিয়! 
বলিয়া! পাঠাইলেন যে, যদি তিনি নিজগুণে কপ! করিয়া একবার 
আসিয়া তাহাদের সভায় পদধূলি দেন, তবে ছুই সহোদর পরম 
চরিতার্থ হইবেন । আমর! জিজ্ঞাসা করি, যিনি জন-কোলাহল 
হইতে দুরে থাকিবার নিমিত্ত বেণাপোলের জঙ্গলে যাইয়া 
'লুকাইয়া থাকিতে চাহিয়াছিলেন, যিনি সর্ববত্যাগী বৈরাগী, 
আর যিনি দিবারাত্রি একান্ত ভজনে রত, সেই ঠাকুর হরিদাস 
কি এরূপ একটি বহুলোকসমাগমপুণ রাজসভায় যাইতে স্বীকৃত 
হইবেন ? কিন্তু মহাপুরুষদিগের চেষ্টাচরিত্র বুঝিবার অধিকার 
আমাদের নাই। যখন বলরাম আচাধ্য হরিদাস ঠাকুরের নিকট 
যাইয়া হিরণ্য-গোবদ্ধনের সভায় গমনের প্রস্তাব উত্থাপন 
করিলেন, তখন ঠাকুর দ্বিরুক্তি না করিয়া তাহাতে সম্মতি 
প্রদান করিলেন । 

পরদিন ঠাকুর হরিদাস বলরাম আচার্যযকে সঙ্গে করিয়া 
হিরণ্য-গোবদ্ধনের সভায় যাইয়া উপস্থিত হইলেন। মানুষ 
হইলেও হরিদাস ঠাকুরের চেহারার ভিতরে অমানুষিক কিছু 
ছিল। এমন মাধুধ্য ও গাস্ভীষ্য নরলোকে ছুল্লভি। বরাঙ্গ 
মহিমাময়, মহা তেজন্বী। নয়নে অপুর্বব জ্যোতিঃ। কিন্তু দৃষ্টি 
স্থির ও স্সেহসিক্ত। ঠাকুর বয়সে প্রোচ-যুবা, কিন্তু দেখিতে 
প্রবীণের স্ায়। ফলতঃ হরিদাস ঠাকুর যখন সভাস্থলে আমিলেন, 
তখন সকলের জ্ঞান হইল, যেন একটি দেব-বিগ্রহ আসিয়া তথায় 


তৃতীয় পরিচ্ছেদ ২৯ 


উপস্থিত হইলেন । হিরণ্য-গোবদ্ধন ছুই ভাই ঠাকুরের চরণ- 
তলে পড়িয়া প্রণাম করিলেন এবং সম্মানপূর্ববক তাহাকে 
স্বতন্ত্র আসনে বসাইলেন। 

“ঠাকুর দেখি দুই ভাই কৈল অভাখান, 

পায়ে পড়ি আমন দিল করিয়া সম্মান ।” 

( শ্রীচৈঃ চঃ) 
সেই সভায় যে সকল বড় বড় পণ্ডিত উপস্থিত ছিলেন, 

তাহারাও ঠাকুর হরিদাসের সৌম্য, শান্ত, ভক্তি-বিলসিত, উজ্জ্বল 
মুদ্তি দর্শন করিয়া সন্ত্রান্তচিত্ত হইলেন এবং অশেষ প্রকারে 
তাহার গুণ-কীর্তন করিতে লাগিলেন। হিরণ্য-গোবদ্ধনের 
মনে একট! ভয় ছিল, না জানি, ব্রাহ্গণ-পপ্ডিতগণ ঠাকুরকে কি 
ভাবে গ্রহণ করেন। এক্ষণে তাহাদিগের এই প্রকার অনুকূল 
ভাব ও শিষ্টাচার দেখিয় ছুই ভ্রাতা আশ্বস্ত ও সুখী হইলেন । 

“হরিদাসের গুণ সবে কহে পঞ্চমুখে, 

শুনিয়৷ সে দুই ভাই ডুবিল বড় সুথে।” 

( শ্রীচৈঃ চঃ) 
ঠাকুর হরিদাস প্রতিদিন তিন লক্ষ হরিনাম জপ করেন, 

শুদ্ধ এই কথাট। জানিতে পারিয়াই পপ্ডিতগণ যেমন বিন্ময়াঁপন্ন 
হইয়াছিলেন, তত্রপ হরিদাস ঠাকুরের প্রতি তাহাদিগের একট 
প্রগাঢ় শ্রদ্ধাও জন্মিয়াছিল। সেই সভায় তাহারা ঠাকুর হরি, 
দাসের প্রশংসা-প্রসঙ্গে নাম-মাহাআ্য সম্বন্ধেও অনেক কথ 
তুলিলেন। কেহ বলিলেন যে, হরিনামের শক্তিতে জীবের 


৩০ ঠাকুর হরিদাস 


পাপ-তাপ বিনষ্ট হয়। কেহ বা বলিলেন যে, হরিনামে জীবের 
মোক্ষ পধ্যন্ত লাভ হইয়া! থাকে । এইরূপে পণ্তিতগাণ শাস্ত্র 
বচন দেখাইয়া এক এক জনে এক এক প্রকার বলিলেন | 

“তিন লক্ষ নাম ঠাকুর করেন গ্রহণ, 

নামের মহিমা! উঠাইল পণ্ডিতের গণ। 

কেহ বলে নাম হৈতে হয় পাপ ক্ষয়, 

কেহ বলে নাম হৈতে জীবের মোক্ষ হয়। 


( শ্রীচৈঃ চঃ) 


ঠাকুর হরিদাস গন্তীর হইয়া সমস্ত শুনিলেন । পরে পণ্ডিত- 
গণকে সন্বোধনপুর্ববক করযোড়ে বলিলেন, “আপনারা যদি 
আমার অপরাধ গ্রহণ না করেন, তবে এ বিষয়ে আমি কিছু 
নিবেদন করিতে ইচ্ছা করি। আপনার! যাহ যাহা বলিলেন, 
সমস্তই সত্য । ' হুরিনামে যে পাপনাশ ও মোক্ষলাভ হয়, ইহাতে 
অপণুমাত্র সন্দেহ নাই, কিন্তু আমি নিবেদন করিতেছি যে, হরি- 
নামের ফল এই পধ্যস্তই নহে। হরিনামে জীবের পঞ্চম 
পুরুষার্থ অর্থাৎ কৃষ্ণ-প্রেম লাভ হইয়া থাঁকে |৮ 
“হরিদাস কছে নামের এ ছুই ফল নহে, 
নামের ফলে কৃষ্ণপদে প্রেম উপজয়ে 1” 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 
শ্রীমপ্ভাগৰত এ সম্বন্ধে বলিয়াছেন-- 
এবংব্রতঃ স্বপ্রিয়নাম কীত্যা জাতানুরাগে দ্রুতচিত্ত উচ্চৈঃ। 
হসত্যথো রোদ্দিতি রৌতি গায়ত্যুন্মাদবন্ন ত্যতি লোকবাহ্‌ঃ ॥ 


তৃতীয় পরিচ্ছেদ ৩১ 


অর্থাৎ এই প্রকারে ভক্তি আচরণ করাই ধাঁহার ব্রত, সেই 

ভক্ত নিজপ্রিয় ভগবানের নাম কীর্তন দ্বার৷ জাতপ্রেমা হইয়া 
বিগলিতচিত্ত হয়েন। এ নিমিত্ত নানা ভাবে কখনও উচ্চ 
হাস্ত, কখনও ক্রন্দন, কখনও চীৎকার, কখনও গান, আর 
কখনও বা নৃত্য করিয়া থাকেন। তখন তাহার ক্রিয়া-মুদ্র। 
সাধারণ লোকের বোধগম্য হয় না। 

“প্রেমার স্বভাবে ভক্ত হাসে কান্দে গায়, 

উন্মত্ত হইয়া নাচে ইতি উতি ধায়। 

স্বেদ, কম্প, রোমাঞ্চাঞ্র, গদ্গদ বৈবণ্য, 

উন্মাদ, বিষাদ, ধৈর্য্য, গর্বব, হর্ষ, দৈন্ 

এত ভাবে প্রেমা ভক্তগণেরে নাচায়, 

কৃষ্ণের আনন্দামত সাগরে ভাসায় 1” 

( শ্রীচৈঃ চঃ) 


ঠাকুর হরিদাস পুনরপি কহিতে লাগিলেন-__“মুক্তিলাভ 
হরি-নাম গ্রহণের চরম ফল নহে। মুক্তিলাভ শুদ্ধ নামাভাস 
হইতেই সিদ্ধ ।হইয়া৷ থাকে। তাহার দৃষ্টান্তস্থল অজামিলের 
উদ্ধার। অজামিল নারায়ণপরায়ণ ছিলেন না। নারায়ণ-নামে 
তাহার শ্রদ্ধাবুদ্ধিও ছিল না। কিন্তু আসন্ন-সৃত্যুর ভয়ে তিনি 
যে তাহার পুজ্রের নাম ধরিয়া “বাব! নারায়ণ “বাবা নারায়ণ 
বলিয়া ডাকিয়াছিলেন, তাহাতেই তিনি মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন। 
সুতরাং হুরিনামে মুক্তি লাভ করা একটা “বেশী কথা নয়। 
অপিচ, হরিনাম গ্রহণের ফলে জীব পরম পুরুতার্থ অর্থাৎ 


৩২ ঠাকুর হরিদাস 


পর! ভক্তিলাভের অধিকারী হইয়া থাকে । পাপনাশ কি 
মুক্তিলাভ নাম-গ্রহণের আনুষঙ্গিক ফল মাত্র। [ভক্ত যখন 
একবার শুদ্ধ-ভক্তিরসের মাম্বাদন পান, হৃদয়ে যখন (প্রম জন্মে, 
তখন তাহার তুলনায় যুক্তি অতি তুচ্ছ ফল বলিয়া! বিবেচিত 
হয়। যিনি ভক্তিধন লাভ করিয়াছেন, তিনি মুক্তি (ব্রহ্ম 
সাযুজ্য ) চাহেন না ।” 


“হরিদাস কহে কেন করহ₹ সংশয়, 
শাস্ত্রে কহে নামাভাস মাত্র মুক্তি হয়। 
ভক্তিন্থখ-আগে মুক্তি অতি তুচ্ছ হয়, 
অতএব ভক্তগণে মুক্তি না ইচ্ছয়। 
আনুষঙ্গিক ফল নামের মুক্তি, পাপনাশ, 
তাহার দৃষ্টান্ত যৈছে সূর্যের প্রকাশ ।* 
(শ্রী চৈঃ চঃ) 


এই কথাট! ভাল করিয়া বুঝাইবার নিমিত্ত হরিদাস-ঠাকুর 

ভাগবতের স্থুপ্রসিদ্ধ টাকাকার শ্রীধরস্বামিকৃত একটি স্থুমধুর 
শ্লোক আবৃত্তি করিয়া পপ্ডিতগণকে বলিলেন, “অনুগ্রহ পূর্ববক 
আপনারাই এই শ্রোকের ব্যাখ্যা শুনাইয়৷ আমাকে কৃতার্থ 
করুন | 

“অংহঃ সংহরদখিলং 

সকৃছ্দয়াদেব সকললোকন্ত 

তরণিরিব তিমিরজলধে- 

অর্য়িতি জগন্ঙ্গলহরের্নাম।” 


তৃতীয় পরিচ্ছেদ ৩৩ 


অর্থাৎ অন্ধকার-সমুত্রে সৃষ্যের ম্যায়, উদযোম্ুখ অবস্থাতেই 
সকল লোকের সর্বপ্রকার পাপান্ধকারহারী জগনম্মঙ্গল হরিনাম 
জয়যুক্ত হউন । 


পণ্ডিতগণের মধ্যে কেহ কেহ আনন্দের সহিত উক্ত 
শ্লোকের ব্যাখ্যা করিলেন। পরে ঠাকুর হুরিদাসের মুখে 
উহার ব্যাখ্যান শুনিবার নিমিত্ত একান্ত আগ্রহ প্রকাশ করিতে 
লাগিলেন। ঠাকুর হরিদাস তাহার স্বভাব-স্থলভ বিনয়ের 
সহিত পণ্ডিতমগ্ডলীর অনুরোধ শিরোধা্য পূর্বক নিম্নলিখিত 
প্রকারে এ শ্লোকের ব্যাখ্যা করিলেন-__ 

“সম্যক্রূপে সূর্য্যোদয় হইতে না হইতেই অন্ধকার তিরোহিত 
হয়। অর্থাৎ অন্ধকার বিনাশ হইবার জন্য আর সম্যক্রূপে 
সূষ্যোদয়ের অপেক্ষা থাকে না। আবার চোর, প্রেত ও 
রাক্ষসাদির ভয়ও সূর্যোদয় হইতে না! হইতেই দূরীভূত হয়। 
অর্থাৎ উহাদিগহইতে আর কোনও রূপ অনর্থের আশঙ্কা 
থাকে না। সম্পূর্ণরূপে সূর্য্য সমুদিত হইলে জীব তখন ধর্ম, 
কম্ম ও মঙ্গলের প্রকাশ দেখিয়া সুখী হয়|” 


“হরিদাস কহে যেছে স্যর উদয় । 
উদয় না হতে আরম্তে তমোক্ষয়, 
চৌর, প্রেত, রাক্ষসাদির ভয় হয় নাশ; 
উদয় হৈলে ধর্ম, কর্মা, মঙ্গল প্রকাশ ।” 


(শ্রী চৈঃচঃ) 


৩ 


৩৪ ঠাকুর হরিদাস 


হরিনাম সম্বন্ধেও ঠিক সেই কথা। সৃষ্যোদয়ারস্তে তমো- 
বিনাশের ন্যায়, চিত্তমধ্যে নামের উদয় হইতে না হইতেই 
পাপান্ধকার দুরে পলায়ন করে এবং কোনও ভয় 1 অন্থের 
আশঙ্কা থাকে না । অর্থাৎ নামাভাসেই পাপ-তাপ দুর হইয়। 
সনর্থের নিবুত্তি হয়-__মুক্তিলাভ হয় । কিন্ত্ব বখন সেই জগন্মজগল 
হরিনাম সমুদ্দিত হয়েন অর্থাৎ স্থপ্রতিঠিত হয়েন, তখন পরম 
মঙ্গল-পদ কৃষ্ণপদে প্রেম জন্মিয়। থাকে ।” 


“তৈছে নামোদয়াপন্তে পাপ আদি ক্ষয়) 
উদয় হৈলে কৃষ্ণপদে হয় প্রেমোর্দয় |” 


( শ্রী চৈ? চঃ) 


হরিদাস ঠাকুধেব ব্যাখ্য। শুনিয়া প্ডিতগণ শতমুখে তাহার 
প্রশংসা করিলেন। কিন্তু হরিনদীগ্রাম-নিবাসী গোপাল চক্রবস্তী 
নামক এক ব্রঙ্ধষণের প্রাণে তাহা সহ্য হইল না। চক্রবর্তী 
মহাশয় হিরণ্য-গোবদ্ধনের অধীনস্থ একজন কম্মচারী। তিনি 
হ্যায়শাস্ত্রের পণ্ডিত, উ্কট তাকিক। এজন্য বলরাম আচার্য 
ঠাহার “ঘট-পটিয়া” আখ্যা দ্রিয়াছিলেন। পণ্ডিতের তর্কশুক্ষ 
প্রাণে ভক্তির মহিমা! ও নাম-মাহাত্্য স্তান পাইল না। ব্রাক্ষণ 
ক্রোধান্ধ হইয়া ঠাকুর হরিদাসের কথার তীব্র প্রতিবাদ করিয়া 
বলিলেন-_ 

“সভাস্থ পণ্ডিতবর্গ! এই ভাবুকের সিদ্ধান্ত শুনিলেন ত ? 
নলে কি না, নামাভাসেই মুক্তিলাভ হয় ! কোটা জঙ্মে ব্র্মজ্ান 


তৃতীয় পরিচ্ছেদ ৩৫ 


দ্বারা যাহ! প্রাপ্ত হওয়। দুষ্কর, নামাভাসেই তাহা লব্ধ হয় ? 
কি অপূর্ব ব্যাখ্যা !” ব্রাহ্মণ ঠাকুর হরিদাসের পানে চাহিয়া 
ভাত নাড়িয়া৷ বলিলেন-_-“ওহে বাপু! যদি নামাভাসে মুক্তি 
না হয়, তবে নিশ্চয় জানিও, আমি গোপাল শন্মা তোমার নাকটি 
কাটিয়! ছাড়িয়া দিব 1» 


“গোপাল চক্রবস্তী নাম এক ব্রাহ্ষণ, 
মজুমদারের ঘরে সেই আরিন্বা প্রধান। 
পর্ম গ্ন্দর পাণ্ডত নবীন যৌবন, 
“লামাভাসে মুক্ত? শুনি না হয় সহন। 
ক্রুদ্ধ হঞ1 বলে সেই সরোষ বচন, 
ভাবুকের সিদ্ধান্ত শুন পণ্ডিতের গণ। 
কোটা জন ব্রন্ধঙ্ঞানে যে মুক্তি না পায়, 
এই কহে নামাভাসে সেই মুক্তি হয় । 
বপ্র কহে নামাভাসে মুক্তি যদি নয়, 
তবে তোমার নাক কাটি, করহ নিশ্চয় ।” 
(শ্রী চৈঃ চঃ) 


ব্রাহ্ষণেব মুখে এই প্রকার অসঙ্গত কর্কশ বাক্য শ্রবণ 
করিযা৷ সভাস্থ পগ্ডিতগণ ও হিরণ্য-গোবদ্ধন দুই সহোদর হাহাকার 
কবিতে লাগিলেন । 
শুনি নব সভা উঠি করে ভাহাকার, 
নভুমদার সেই বিপ্রে করিল ধিক্কার» 
( শ্রী চৈঃ চঃ) 


৩৬ ঠাকুর হরিদাস 


সভাশুদ্ধ লোক ঠাকুর হরিদাসের চরণে পতিত হইয়া ক্ষমা 
ভিক্ষা করিলেন। ঠাকুর তাহাদিগকে মধুর বাক্যে সাস্তবনা 
করিয়া বলিলেন--“আপনাদিগের কিছুমাত্র দৌষ নাই। এই 
্রাহ্মণেরও কোনও দোষ আমি দেখিতেছি না ইহার তর্কনিষ্ঠ 
মন। তাই ইনি ভক্তির মাহাত্ম্য বুঝিতে পারেন নাই। আপনার! 
আমার সম্বন্ধে মনে কিছু দুঃখ রাখিবেন না। এক্ষণে সকলে গৃহে 
গমন করুন। কৃষ্ণ আপনাদিগের মঙ্গল করুন 1৮ 


“সভ। সহিতে হরিদাসের পড়িল চরণে, 
হরিদাস হাসি কহে মধুর বচনে-_ 
তোমা সবার কি দোষ? এই অজ্ঞ ব্রাহ্মণ, 
তার দোষ নাহি তার তর্কনিষ্ঠ মন। 
তর্কের গোচর নহে নামের মহত্ব, 

কোথা ছৈতে জানিবে সে এই সব তত্ব? 
যাহ ঘর, কৃষ্ণ করুন কুশল সবার, 

আমার সম্বন্ধে হুঃখ না! হউক কাহার ।৮ 


(শ্রী চৈঃ চঃ) 


উক্ত ঘটনাপ্রসঙ্গে ঠাকুর হরিদাসের সহিত গোপাল চক্রবস্তীর 
যেরূপ কথোপকথন হইয়াছিল, শ্রীল বৃন্দাবন দাস তাহার 
লিখিত শ্রীচৈতন্তভাগবতে তাহা আরও একটু বিস্তার করিয়। বর্ণনা 
করিয়াছেন। তাহার কিঞ্ি এ স্থলে উদ্ধত করিলাম । 


তৃতীয় পরিচ্ছেদ ৩৭ 


গোপাল চক্রবর্তী বলিলেন-__ 


“ওহে হরিদাস! এ কি ব্যাভার তোমার, 
ডাকিয়া যে নাম লহ কি হেতু ইহার? 
মনে মনে জপিবা এই সে ধর্ম হয়, 
ডাকিয়া লইতে নাম কোন্‌ শাস্ত্রে কয়? 
কার শিক্ষা হরিনাম ডাকিয়া লইতে ? 
এই ত পণ্তিত-সভা, বলহ ইহাতে ।” 
“হরিদাস বলেন-__ইহার যত তত্ব, 
তোমরা সে.জান ভরিনামের মাহাত্মা | 
তোমর! সবার মুখে শুনিয়া সে আমি, 
বলিতে কি বলিলাউ যেবা কিছু জানি। 
উচ্চ করি লইলে শত গু৭ পুণ্য হয়, 
দোষ ত না কহে শাস্বে গুণ সে বর্ণয়।” 
“বিপ্র বলে-_উচ্চ নাম করিলে উচ্চার, 
শত গুণ ফল হয় কি হেতু ইহার ?” 
“হরিদাস বলেন-_ শুনহ মহাশয়, 

যে তত্ব ইহার বেদ ভাগবতে কয়। 
পশু, পক্ষী, কীট আদি বলিতে না পারে, 
শ্টনিলেই হরিনাম তার! সবে তরে । 
জপিলে সে কষ্ণনাম আপনি সে তরে, 
উচ্চ সংকীর্ভনে পর-উপকার করে। 
অতএব উচ্চ করি কীর্তন করিলে, 

শত গুণ ফল হর সর্ব-শান্ত্রে বলে ।” 


৩৮ ঠাকুর হরিদাস 


তথাছ্ছি আ্রীমন্ভাগবতে দশম স্কন্ধে সুদর্শনবাক্যং__ 


ষন্নাম গৃহ্ৃন্নথিলান্‌ শ্রোতৃনাত্মানমেবচ | 
সগ্ঃ পুনাতি কিং ভূয়স্তন্ত স্পৃষ্টঃ পদাহি তে ॥ 


অর্থ__“জীব ধাহার একটি মাত্র নাম কেবল উচ্চারণ করিতে 
করিতেই আপনাকে এবং আপনার ন্যায় নিখিল শ্রোতৃবর্গ ও 
সেই শ্রোতৃবর্গের সংসর্গীদিগকে সগ্ভই পবিত্র করিয়া থাকেন, 
সেই তোমার চরণ-স্পৃষ্ট হইয়া আমিও যে নিশ্চয়ই আপনাকে 
ও আর আর সকলকে অধিকতর রূপে পবিত্র করিব, তাহার 
আর কথা কি'?” 


তথাহি নারদীরে প্রহলাদবাকাং_ 


বপতো হরিনামানি স্থানে শতগুণাধিক2 | 
আত্মানঞ্চ পুনাতুাচ্চৈর্জপন্‌ শ্রোতৃন্‌ পুনাতি চ ॥ 


অর্থ-_-“ষে ব্যক্তি মনে মনে হরিনাম জপ করেন, তাহার 

অপেক্ষা উচ্চকণে নাম জপকারী যে শতগুণে শ্রেষ্ট, ইহা 
যুক্তিযুক্ত কথা । কারণ, মনে মনে জপকারী কেবল আপনাকেই 
পবিত্র করেন, আর উচ্চৈঃস্বরে জপকারী আপনাকে এবং 
শ্রোতৃবৃন্দকেও পবিত্র করিয়া থাকেন ।” 

“সেই বিপ্র শুনি হরিদাসের কথন, 

বলিতে লাগিল ক্রোধে মহা দুর্বচন-_ 

দরশনকর্তী এবে হৈল হরিদাস ! 

কালে কালে বেদ-পথ হয় দেখি নাশ। 


তৃতীয় পরিচ্ছেদ ৩৯ 


যুগশেষে শৃদ্রে বেদ করিবে বাখানে, 

এখনই দেখি তাহ! শেষে আর কেনে? 

যে ব্যা্যা করিলি তুই এ যদি না লাগে, 

তবে তোর নাক কান কাটি তোর আগে ।” 

( শ্রীচৈতন্ততভাগবত ) 
মহতের লঙ্ঘনের যে ফল, এ ক্ষেত্রেও তাহা! ফলিল। সত্য 

বটে, ধিনি ভগবন্তক্ত, তিনি কখনও নিজের প্রতি অপরাধকারীর 
অপরাধ গ্রহণ করেন না । কিন্তু ভক্তবতসল ভগবান্‌ ভক্ত-নিন্দ! 
সহিতে পারেন না। কিসে কি হয়, তাহ। আমরা জানি না 
এবং ন্মচক্ষে প্রত্যক্ষ দেখিয়া যাহা জানি, মুঢ়তা বশতঃ দিন 
পরে তাহাও মানি না। অভিমান-উষ্ণ অস্তঃকরণে “্ধর্শ্মের 
কাহিনী” দাড়ায় না । হিরণ্য ও গোবদ্ধন সেই দিনই গোপাল 
চক্রবস্তীকে কাধ্য হইতে অপসারিত করিয়া দিলেন । গোপালের 
আর যে ছুর্দশ। হইল, তাহা শুনিতে প্রাণ কাপিয়া উঠে । 

“তিন দিন মধো সেই বিপ্রের কুষ্ঠ হৈল, 

অতি উচ্চ নাসা তার গলির! পড়িল। 

চম্পক-কলিক1 সম হস্তপদাশুলী 

কৌকড় হইল সব কুষ্ঠে গেল গলি। 

য্পি হরিদাস বিপ্রের দোষ না লইল, 

তথাপি ঈশ্বর তারে ফল ভূঞ্জাইল। 

ভক্তের স্বভাব অজ্ঞের দোষ ক্ষমা করে, 

কৃষ্ণস্বভাব ভক্তনিন্দা সহিতে না পারে |” 

(শ্রী চৈঃ চঃ) 


৪৬ ঠাকুর হরিদাস 


সাক্ষাৎ দয়ার বিগ্রহস্থরূপ ঠাকুর হরিদাস বলরাম আচার্য্যের 
মুখে ব্রাঙ্ষণের উক্তরূপ শোচনীয় অবস্থার কথা শুনিয়া অশ্রু 
সংবরণ করিতে পারিলেন না । ফলতঃ ঠাকুর ব্রাহ্মদৌর ভুঃখে 
প্রাণে এতই ব্যথ৷ পাইয়াছিলেন যে, সেই দিনই তিনি ঠাদপুর 
পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন । 

“বিপ্রের হুঃখ শুনি হরিদাসের হুঃখ হৈলা, 
বলাই পুরোহিতে কহ শাস্তিপুরে আইলা 1” 
( শ্রী চৈঃ চঃ) 

এই চাদপুর গ্রামে ঠাকুর হরিদাস পরবর্তী কোনও সময়ে 
আরও একবার আসিয়াছিলেন। তখন গোবদ্ধন দাসের পুক্ত 
রথুনাথ দাস অল্পবয়স্ক বালক। রঘুনাথ বলরাম আচার্যের 
নিকট যাইয় প্রতিদিন শান্ত্রাধ্যয়ন করিত। এমন সর্ববস্থুলক্ষণ- 
সম্পন্ন প্রথরমেধাশালী বালক আচাধ্যের টোলে ইতিপূর্বে 
আসে নাই,। এত বড় বাপের বেটা, কিন্তু বালকের চরিত্রে 
অভিমানের গন্ধমাত্র ছিল না। ঠাকুর হরিদাসের ভজনে আকৃষ্ট 
হইয়া রঘুনাথ একদিবস তাহার কুটারের দ্বারে যাইয়া তাহাকে 
প্রণাম করিয়৷ বিনীতভাবে দীড়াইয়া রহিল। ঠাকুর তাহার 
মুখের পানে তাকাইয়৷ কি দেখিলেন, কি বুঝিলেন, তাহা তিনিই 
জানেন। এমন বিষয়-বিরাগী ত্যাগী পুরুষ হরিদাস ঠাকুর কিন্তু 
সেই দিন.হইতে বালকটীকে একান্ত নেহ করিতে লাগিলেন । 
বালকটিও ভক্তির আকর্ষণে পড়িয়৷ প্রত্যহ ছুই বেলা ঠাকুরের 
নিকট না আসিয়া থাকিতে পারিত না। এই বালকই উত্তরকালে 


তৃতীয় পরিচ্ছেদ ৪১ 


বৈরাগীর শিরোমণি রঘুনাথ দাস গোস্বামী নামে বিখ্যাত হইয়া- 
ছিলেন । 
“রঘুনাথ দাস বালক করে অধ্যয়ন, 
হরিদাস ঠাকুরে নিত্য যাই করেন দর্শন। 
হরিদাস কৃপ। করে তাহার উপরে, 
সেই কৃপা কারণ হৈল চৈতন্ত পাইবারে |” 
(শ্রী চৈঃচঃ) 


চতুর্থ পরিচ্ছেদ 


শান্তিপুরে 
যে সময়ের প্রসঙ্গ হইতেছে, তগকালে শ্াস্তিপুরের প্রধান 
ব্যক্তি ছিলেন শ্রীমদ্বিত আচার্য । শ্রীহট জিলার অন্তর্গত 
লাউড় নামক এক গগুগ্রামে ১৩৫৫ শকে শুভ মাঘী সপ্তমী 
তিথিতে তাহার জন্ম হয়। * পিতার নাম কুবের আচার্য ও 
মাতার নাম লাভা দেবী। কুবের আচায্য পরিণত-বয়সে শ্রীহট্ট 
হইতে গঙ্গাতীরে শাস্তিপুরে আসিয়া সপরিবারে বসবাস করেন। 








পাস 





স্পা 


জীগৌরাঙ্গকে স্তিকা-গৃহে দেখিতে যাইয়া! শ্রীঅদ্বৈত বলিয়াছিলেন,_ 
“ক্বহে বিভু আজি দ্বিগঞ্চাশ বর্ষ হৈল, 
তুয়৷ লাগি ধরাধামে এ দাস আইল ।” 
( জ্ীঅইবৈতপ্রকাশ ) 
্রীগৌরাঙ্গের আবির্ভাব ১৪*৭ শকে। তখন জীঅইৈতের বয়স ৫২ বৎসর । সুতরাং 
অনৈত প্রভুর জন্মনন ১৩৫৫ শক! 


৪২ ঠাকুর হরিদাস 


নবদ্বীপেও তাহার একটি বাস-ভবন ছিল। শ্রীঅদ্বৈতচন্দ্র তাহার 
প্রথম যৌবনে একজন বিখ্যাত বৈদাস্তিক পঞ্ডিত্ব ছিলেন। 
তখন তাহার নাম ছিল কমলাক্ষ আচাধ্য, 2 বেছ- 
পঞ্চানন । পরে তিনি অদ্বৈত আচাধ্য নামে পরিচিত হয়েন। 
তিনি যেমন জ্ঞানী ছিলেন, ভক্তিশান্ত্রেও তাহার তন্রপ প্রগাঢ় 
নিষ্ঠা ও অসাধারণ অধিকার ছিল। এক কথায় বলিতে গেলে, 
আচাধ্য জ্ঞানের হিমালয় ও ভক্তির প্রশান্ত মহাসাগর ছিলেন । 
তিনি শ্রীপাদ মাধবেন্দ্র পুরী গোসাঞ্চির নিকট দীক্ষিত হইবার 
পর হইতে কখনও নবদীপে এবং কখনও শাস্তিপুরে থাকিয়া 
ভক্তিধন্্মাচরণ ও ভক্তি-শান্দ্রের ব্যাখ্যান দ্বারা দেশের ও সমাজের 
কল্যাণ-ব্রতে ব্রতী হইলেন। নবদ্বীপ ও শান্তিপুর এই উভয় 
স্থানেই তাহার টোল ছিল। 

তৎকালে দেশমধো ধশ্মেব অবস্থা অতিশয় কান হইয়া 
পড়িয়াছিল। লোকসকল কৃষ্ণভক্তিহীন ও একান্ত বহিম্ম,খী। 
সমাজ নীরস, শুক্ষ__মরুভূমিতুল্য । আচার্ধা যে দিকে দৃষ্টিপাত 
করেন, সেই দ্রিকেই দেখেন- কেবল পাপ, ভাপ, জ্বালা । ধন, 
জন, এঁশবর্য, দত্ত ও অভিমান লইয়া লোকেরা সতত উন্মস্। 
তাহার স্থখের লাগিয়া সকল করিতেছে, কিন্তু প্রাণে সখ পাই- 
তেছে না। নরনারী শান্তিহারা। সমস্ত সংসার যেন ধক্‌ ধক্‌ 
করিয়া জ্বলিতেছে। যাহাতে ভব-রোগ দূর হয়, যাহাতে হাদয়ের 
তাপ বায়, যাহাতে প্রাণ শীতল হয়, সেই পরম বস্-_সেই বিজু 
ভক্তি বিস্মৃত হইয়া জীব ত্রিতাপে জ্বলিয়া পুড়িয়া মরিতেছে । 


চতুর্থ পরিচ্ছেদ ৪৩ 


ইহ! দেখিয়া সেই মহান্‌ বিশ্বপ্রেমিক শ্রীঅদ্বৈতাচার্য্যের প্রাণ 
কীদিয়া উঠিল। জীবের ছুঃখ দিবানিশি তাহাকে বিহ্বল 
করিতে লাগিল। জীবের ছুঃখ-তাপ দূর করিতে হইবে, ভক্তির 
অমুত-সেকে জীবের প্রাণ শীতল করিতে হইবে, কৃষ্ণপ্রেমে 
সকলকে কাদাইতে হইবে, ইহাই প্রভু অদ্বৈতের প্রতিজ্ঞ । 
এই উদ্দেশ্যে আচাধ্য আপাততঃ কখনও নবদীপে, আর কখনও 
বা শান্তিপুরে থাকিয়া ভক্তি-তত্ব ব্যাখ্যান করিতে লাগিলেন, 
আর কাতরপ্রাণে অনুক্ষণ “হা! গোবিন্দ” বলিয়া ভক্তিদাতা 
ভগবানকে ডাকিতে লাগিলেন । 

এই সময়ে ঠাকুর হরিদাস শান্তিপুরে আসিলেন। অদ্বৈত- 
প্রভু তখন শান্তিপুরের বাঁটাতেই ছিলেন। হরিদাস প্রভুর 
চরণে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিয়া করযোড়ে দণ্ডায়মান রহিলেন। 
আচার্ধ্য তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিবামাত্র চিনিলেন-__ ইনি 
হরিদাস ঠাকুর । হরিদাসকে দেখিয়। তীহার স্থখের সাগরে তরঙ্গ 
উঠিল, কিন্তু তথাপি একটু ভঙ্গী করিয়া জিজ্ভাসা করিলেন,_- 

“আপনি কে? কি নিমিত্ত এ স্থানে আগমন £” 

হরিদাস ঠাকুর বিনয়-বিজড়িত কণ্টে উত্তর করিলেন, 

“প্রভো ! আমি ক্ষুত্র জীব ; জাতিতে অধম য্লেচ্ছ । আপন- 
কার শ্রীচরণ-দর্শনমানসেই এ স্থানে আসিয়াছি ৷” 

ণ্্রন্দ হরিদাস কহে মুঞ্ঞি মনেচ্ছাধম, 
আসিয়াছে! তুয়া পদ করিতে দর্শন |” 
( শ্রাঅঃ প্রঃ) 


৪৪ ঠাকুর হরিদাস 


হরিদাসের এই প্রকার দেন্যোক্তি শুনিয়া আচার্ধ্য 
কহিলেন,__ 

“মহাশয় ! কে ছোট, কে বড়, কে কোন্‌ জীতি, তাহা 
আমি সম্যক্‌ বুঝিতে অক্ষম । আমার মতে ধাহার আঙরণ সাধু, 
তিনিই শ্রেষ্ঠ; আর, যিনি বিষুভক্ত, তিনিই দ্বিজ।৮ 

“কেবা ছোট কেবা বড় স্থৈর্যা নাহি জানি, 
নাধু আচরণ ধার তারে শ্রেষ্ঠ মানি। 
অষ্টবিধ ভক্তি যদ্দি শ্নলেচ্ছে উপজয়, 
সেই জাতি লোপ হঞা দ্বিজাদেশ হয় ।” 
| ( শ্রীঅঃ প্রঃ) 
প্রীঅদ্ধৈত আচাধ্য ও ঠাকুর হরিদাস এত দিন দুরে দুরে 
থাকিয়াও, পরস্পরকে ভালরূপে জানিয়াছিলেন ; ছু'য়ের মধ্যে 
বিনা পরিচয়েও বিশিষ্ট পরিচয় হইয়াছিল। এক্ষণে উভয়ের 
সাক্ষাদ্দর্শনে উভয়ের হৃদয়ে প্রেমের তরঙ্গ উথলিয়া উঠিল, 
পরস্পর আলিঙ্গনপাশে আবদ্ধ হইয়া প্রেমজলে ভাসিতে 
টোলেন। এইরূপে ভক্তির দুইটি প্রবল প্রবাহ একত্র 
মলিত হইয়া, উত্তরকালে কৃষ্ণভক্তির বন্যায় দেশ ভাসাইবে 
বলিয়াই যেন কিছু কালের জন্য একস্থানে থাকিয়া তোলপাড় 
করিতে লাগিল । 

আচার্য্য গঙ্গার তীরে অতি নির্জন প্রদেশে হরিদাস ঠাকুরের 
ভজনের নিমিত্ত একটি গোফা নিশ্মাণ করিয়া দিলেন। ঠাকুর 
সেই গোফামধ্যে থাকিয়। পরম স্থখে আপনার প্রিয় ব্রত অর্থাৎ 


চতুর্থ পরিচ্ছেদ ৪৫ 


দিবারাত্রে তিন লক্ষ হরিনাম-জপ-রূপ ব্রত উদঘাপন করিতে 
লাগিলেন। ভিক্ষার অনুরোধে তিনি দিনের মধ্যে একবার 
অদ্বৈত-গুহে গমন করিতেন। তদুপলক্ষে অদ্বৈত প্রভুর সহিত 
কৃষ্ণ-কথায় কিছুকাল অতিবাহিত করিয়া গোফায় ফিরিয়! 
আসিতেন। 

উল্লিখিত গোফা৷ আর কিছুই নহে, মাটীর একটি গর্ভবিশেষ। 
গঙ্গার উচ্চ পাড়ে বহির্রেশ হইতে খনন করিয়া একটি কোঠার 
ম্যায় করা । উহার একটি মাত্র দরজা-_গঙ্গার দিকে । গোফার 
ভিতর ও সম্মুখভাগ গোময় দ্বারা লেপিত। দরজার এক 
পার্থ গোময়-লেপিত বেদীর মধ্যস্থলে এক ঝাড় কষ্ণতুলসী। 
ঘরে বাঁসয়াই গঙ্গা-দর্শন হয়। ভজনের পক্ষে ইহা অপেক্ষা 
মনোরম স্থান আর কি হইতে পারে ? 

এমন নির্ভন পবিত্র স্থান পাইয়া! ঠাকুর হরিদাস মনের স্থুখে 
ভঙ্গন করিতে লাগিলেন। কিন্তু ষে স্থানে এক ফোটা মধু, 
নেই স্থানেই পিপীলিকার জাঙ্গাল ! ইহা অনিবার্ম্য । হরিদাস 
ঠাকুরের স্থানে একটি দুইটি করিয়া ক্রমে বুলোকের সমাগম 
হইতে লাগিল । অনেকেই তাহার ভক্ত হইলেন। 

কথিত আছে, বুদ্ধদেব যখন নির্ববাণলাভের কামনায় গয়ার 
টরণ্য প্রদেশে বোধিদ্রমতলে পদ্মাসনে বসিয়া মহাসাধনায় নিমগ্ন, 
টা বারংবার মার আসিয়া নানা প্রকার বিভীষিকা ও 
$লাভন দেখাইয়া তাহাকে পরীক্ষা করিয়াছিল। তক্তির মহা 
রক ঠাকুর হরিদাসের জীবনেও বারংবার লৌকিক ও 







৪৬ ঠাকুর হরিদাস 


অলৌকিক পরীক্ষা আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে । কিন্তু ভগ- 
বানের পাদপদ্সে ধাহার চিত্বভূঙ্গ নিত্যযুক্ত হইয়া রহিয়াছে, 
ভাহাকে কোনও প্রকারের বিভীষিকা-প্রলোভন্‌ দেখাইয়া 
বিচলিত করিতে পারে, এমত, সাধ্য কার? বেণাপোলের ন্যায় 
এই শাস্তিপুরের আশ্রমেও হরিদাস ঠাকুর এক পরীক্ষার মধ্যে 
পড়িয়াছিলেন । এবারে পরীক্ষা বর্থরিতে আসিয়াছিলেন স্বয়ং 
মায়া। ঘটনা অলৌকিক, কিন্তু তাহাংধতে অবিশ্বাস করিবার 
কিআছে? এমন বহু ব্যাপার আছে, যাহা আ+মাদিগের সাধারণ 
জ্ঞানবুদ্ধির অগোচর। 


হরিদাস ঠাকুর গোফাতে বসিয়া উচ্চকণ্টে হরিনাম কীর্তন 
করিতেছেন । জ্যোতসাবতী রাত্রি । দশদিক্‌ স্থৃনির্ম্মল ৫ সম্মুখে 
জাহবী তরঙ্গের পর তরঙ্গ তুলিয়া বহিয়া৷ যাইতেছেন । ঠেশোফার 
সম্মুখে গোময়-স্থুলেপিত পিগুার উপরে তুলসী-মহারাণী "গায়ে 
জ্যোগুসা মাখাইয়! হাসিতেছেন । ন্ুন্দর ঠাকুর হন্দর সৃলরিলিত 
কণ্টে গগনে পবনে হরিনামের মধু ছড়াইতেছেন। দেশ, কান ৭, 
পাত্র সকলই মধুর, সকলই মনোরম । এহেন কালে অঙ্গে? সব 

সৌরতে দশদিক আমোদিত করিয়া কণকণিতাভরণা কণক-বরণ 

এক কামিনী আপিয়া তুলসী-প্রগ্রাম ও তুলসী-পরিক্রমা পুর্ব 

সহসা ঠাকুরের সম্মুখে দীড়াইলেন । 

ঙত্র 

"হেন কালে এক নারী অঙ্গনে আইলা, প্রত 

তার অঙ্গকাস্ত্যে স্থান গীতব্ণ হৈলা। দাধ1ত 


চতুর্থ পরিচ্ছেদ ১৭ 
তার অঙ্গগন্ধে দশদিক আমোপিত, 
ভূষণের ধ্বনিতে কণ হয় চমকিত। 
আসিয়া তুললীকে সেই কৈল নমস্কার, 
ভুলপী পারক্রমা করি গেলা গোফা-দ্বার ।* 


( শ্রীচৈঃ চঃ) 


সেই অলোকসামান্যা নাঁরী হরিদাস ঠাকুরের চরণে প্রণাম 
করিয়া মৃদু-মধুর কণ্টে বলিলেন, “ঠাকুর! তুমি জগতের 
বন্দনীয়। তুমি রূপবান্, গুণবান্‌। তুমি সাধু। দীন জনে 
দয়ী করাই সাধুর স্বভাব। আমি তোমার কৃপার ভিখারী, 
জ্গামাকে অঙ্গীকার কর।” 


«মোরে অঙ্গীকার কর হইয় সদয়, 
দীনে দয়া করে এই সাধু-স্বভাব হয় ।” 
(শ্রীচৈঃ চঃ) 


পি 


নিরন্তর কৃষ্ণনামে আবিষ্টচিত্ত, নিৰিবকার, গম্ভীরাশয় 
ঠাকুর হরিদাস রমণীকে কহিলেন-_- 


“দ্বারে বসি শুন তুমি নাম-সংকীর্তন, 
নাম-সমাঞ্যে করিব তোমার গ্রী(ত-আচরণ |” 


(শ্রীচৈঃ চঃ) 


সেই বেণাপোলের জঙ্গলে যেমন-যেমন হইয়াছিল, এই 
পতিতপাবনী স্থুরধুনীর তট-ভূমিতেও আবার তিন রাত্রি ব্যাপিয় 


৪৮ ঠাকুর হরিদাস 


যেন তাহারই পুনরভিনয় হইয়া গেল। তৃতীয় রাত্রির 
অবসান-কালে-__ 


“তবে নারী কহে তারে করি নমস্কার, 
আমি মায়া, করিতে আসিলাম পরীক্ষা তোমার । 
্রহ্মাদি জীব মুগ সবারে মোছিল, 
একেলা তোমারে আমি মোহিতে নারিল। 
মহা! ভাগবত ভুমি, তোমার দর্শনে, 
তোমার কীর্তনে কৃষ্ণনাম-শ্রুবণে 
চিত্ত শুদ্ধ হল, চাহি কৃষ্ণনাম লৈতে, 
কষ্ণ-নাম উপদেশি কৃপা কর মোতে ।” 
(শ্রীচৈঃ চঃ) 


ঠাকুর হরিদাস কহিলেন-_ 


“দেবি! আপনার চরণে নমস্কার । আমি অধম, ক্ষুদ্র 
কীট । আমার উপর এই পরীক্ষা ! কিন্তু আমার মনে বড়ই 
কুতৃহল হইতেছে,_-আপনি কি নিমিত্ত কৃষ্ণনামের জন্য এরূপ 
ব্যাকুলতা প্রকাশ করিতেছেন ?” 


মায়া বলিলেন__ 


“পুর্বে আমি রামনাম-পাঞ্াছি শিব হৈতে, 
তোমার সঙ্গে লোভ হৈল কৃষ্ণনাম লৈতে । 
মুক্তি হেতু তারক হয়েন রামনাম, 
কষ্ণনাম পারক, করেন প্রেম দান ।” 
( শ্রীচৈঃচঃ) 


চতুর্থ পরিচ্ছেদ ৪৯ 


ঠাকুর হরিদাস পুনরায় হরিনামকীর্তনে নিবিষ্ট হইলেন। 
মায়া ভক্তের মুখ-নিঃস্থত কৃষ্ণ নাম হৃদয়ে রোপন করিয়া সহসা 
আস্তহিত হইলেন। 

দ্রিনের পর দিন যাইতে লাগিল। হরিদাস ঠাকুরের কুটারে 
লোকসমাগমও বাঁড়িয়া চলিল। এদিকে শ্ীঅদ্বৈত, ঠাকুর 
হরিদাসকে এত আদর, যত্বু ও সম্মান করিতে লাগিলেন যে, 
নিক্ষিঞ্চন হরিদাস ঠ।কুর তাহাতে নিতান্তই কুষ্টিত হইলেন এবং 
এক দিন আচাধাকে সন্দোধন করিয়া তাহার কাছে আপনার 
মনের কথা অকপটে বলিয়া ফেলিলেন। 


“হরিদাম কহে গোসাঞ্িঃ করি নিবেদন, 
মোরে প্রত্যহ অন্ন দাও কোন্‌ প্রয়োজন? 
মহ] মহ। বিপ্র হেথা কুলীন-সমাজ, 
আমারে আদর কর না বাসহ লাজ। 
অলৌকিক আচার তোমার কহিতে পাই ভয়, 
সেই কৃপা করিবা যাতে মোর রক্ষা হয়। 
আচাধ্য কহেন--তুমি না করহ ভয়, 
সেই আচৰিব, যেই শান্ত্রমত ভয় । 
তুমি খাইলে হয় কোটি ব্রাহ্মণ-ভোজন, 
এত বলি শ্রাদ্ধপাত্র করাইল ভোজন |” 

( শ্ীচৈঃ চঃ) 


হরিদাস ঠাকুর মহা বিপদে পড়িলেন । যিনি অপরকে মান 


দিবার জন্যই সতত সচেষ্ট, যিনি আপনাকে তৃণ হইতেও নীচ 
৪ 


৫০ ঠাকুর হরিদাস 


দীনাতিদীন মনে করেন, এমন যে নিষ্ষিঞ্চন ভক্ত ঠাকুর হরিদাস, 
তিনি কি শ্রীঅদ্বৈতৈর এত মান-মধ্যাদা সহা করিতে পারেন ? 
ভাবিয়া দেখুন, ব্রাহ্মণের শ্রাদ্ধপাত্রান্ন ভোজন! বেদবিৎ 
ব্রাহ্মণ ভিন্ন অপর কাহাকেও শ্রান্ধের পাত্রান্ন লি করান 
শাস্ত্রে নিষিদ্ধ । হরিদাস মনে মনে বলিলেন-_-না,।আর নয়।, 
প্রকাশ্যে অদ্বৈত প্রভূকে বলিলেন__ 


“অহে প্রভু আজ্ঞা দেহ যাও বিরলেতে, 
অবিশ্রান্ত হরিনামামূত আন্বাদিতে |” 


প্রভূ কহে, “তে বিচ্ছেদে মোর প্রাণ ফাটে, 
নিষেধিতে ন। পারি ভজনের বিদ্ব ঘটে।” 


হরিদাস প্রভৃপদে দণগ্ডবৎ কৈলা, 
প্রেমাবেশে প্রভূ তাঁরে গাঢ় আলিঙ্গিল!। 


হরিদাস কহে, পমুণ্ি অন্পৃশ্ঠ পামর, 
মোর অঙ্গ ছুই কেন অপরাধী কর?” 


প্রভূ কহে, “নাহি বুঝি সজাতি ভুর্জাতি, 
যেই কৃষ্ণ ভজে সেই শ্রীবৈষ্ব জাতি ।” 


হরিদাস কনে, পপ্রভৃ, সকলি সম্ভব, 
তুয়া সুনির্্মল কৃপা ষদি হয় জীবে ।” 
এত কহি করষোড়ে প্রত আজ্ঞা লঞ, 
ফুলিয়! গ্রামেতে গেল৷ হরি সঙরিয়া |» 


( শ্রীঅদ্বৈতপ্রকাশ) 





৫১ পৃ 


তপ্রভুর ভজন-স্থান- বাবলা, শাস্তিপুর | 


চতুর্থ পরিচ্ছেদ ৫১ 


শাস্তিপুরের উপকণ্টে % “বাবলা” নামক স্থানে ঠিক গঙ্গার 
উপর অদ্বৈত প্রভুর একটি নিজ্জন ভজন-স্থান ছিল। তিনি 
অধিকাংশ সময়ই সেই স্থানে আপন ভজনে নিযুক্ত থাকিতেন। 
মাঝে মাঝে আসিয়৷ পড়,য়াদিগকে পাঠ দিয়া যাইতেন। 
হরিদাস ঠাকুর শাস্তিপুর পরিত্যাগ করিলে পর অদ্বৈতাচাধ্য 
বাবলায় চলিয়া আসিলেন। চতু্দিকে ধর্মের গ্রানি দেখিয়। 
জীবের দুঃখে তাহার প্রাণ কাদিয়াছিল। তিনি ন্ুরধুনীর তীরে 
সেই বাবলায় বসিয়া করপুটে গঙ্গাজলতুলসী লইয়া “হা কৃষ্ণ, 
হা গোবিন্দ” বলিয়া জঙ্কার করিতে লাঁগিলেন। স্বয়ং ভগবান্‌ 
অবতীর্ণ না হইলে ধর্মের গ্রানি কে দূর করিবে? জগতে 
ভক্তির ধর্ম, প্রেমের ধর্ম সংস্থাপন করিতে তিনি ভিন্ন আর কে 
পারে? সেই গোলোকবিহারী ভূভারহারী শ্রীহরিকে ধরাধামে 
আনিতেই হইবে, প্রাণে এই আশা, এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা লইয়া 


* জ্রীঅছৈতের সেই ভজন-স্থান “বাবলা-পাট” নামে প্রসিদ্ধ । প্রতি বৎসন্গ 
সপ্তম দোলের প্রিন সেখানে মহোৎসব হইয়া থাকে | যাঝে যাঝে শিক্ষিত-সযাজের 
বন ভক্তসজ্জন সে স্থানে যাইয়! কীর্তনোৎসব করিয়া থাকেন। সেই প্রাচীন স্থান 
আর সেই প্রাচীন গঙ্গার ধাত অগ্যাবধি বর্তমান | অতি মনোরম স্থান। স্থানের 
অদাধারণ প্রভাব অগ্যাবধি ন্ুভূত হইয়া থাকে । একটি ক্ষুত্র মন্দিরে শ্রীত্রীসীতা- 
নাথের শ্রীবিগ্রহ পুজিত হুইয়! থাকেন। মন্দিরটির অবস্থা! শোচনীয়। সম্মুখে 
একটি নাটমন্দির আছে। তাহার একাংশ ভূমিসাৎ হইয়াছে । খীহার ছস্কারে 
শ্রীগৌরাঙ্গ সাঙ্গোপাঙ্গে আসিয়াছিলেন, সেই সীতানাথ শ্রীঅন্বৈতের এই আদি 
ভজন-স্থলীর প্রতি বৈষ্ণব-সাধারণের কিছুমাজ দৃষ্টি নাই, ইহা! বড়ই পরিতাপের 
বিষয়। 


৫২ ঠাকুর হরিদাস 


অদ্বৈত-সিংহ রোমাঞ্চিত-কলেবরে শ্রীগোবিন্দের নামে ঘন ঘন 
গভ্জন করিতে লাগিলেন। হরিদাস ঠাকুর এক্ষণে যে স্থানে 
গমন করিলেন, সেই ফুলিয়া গ্রাম বাবল৷ হইতে অল্প 
ব্যবধান মাত্র । 


পঞ্চম পরিচ্েদ 
ফুলিয়ায় 


ফুলিয়া শান্তিপুরের নিকটবর্তী একটা গ্রাম। পূর্বে 
ইহার পার্থ দিয়া গঙ্গ। প্রবাহ্িতা ছিলেন । অগ্ভাবধি তাহার 
চিহ্ন বর্তমান আছে। এক্ষণে স্ুরধুনী ভিন্নপথগামিনী | শাস্তি- 
পুরের হ্যায় ফুলিয়াও ব্রান্ষণ-পণ্ডিতের স্থান__বদ্ধিষুণ গ্রাম। 
ব্রাহ্মণ-সমাজের শ্রেষ্ট কুলীন “ফু'লেব মুখুটিশদিগের আদি 
বাসস্থান এই ফুলিয়া। আর, যিনি সরল-সুললিত পদ্ঘে রামায়ণ 
রচনা করিয়া বঙ্গভূমি ও বঙ্গভাষাকে এক অপুর্বব ম্বৃত-সপ্তীবনী- 
রসে সরস করিয়৷ গিয়াছেন, বঙ্গের সেই অমর-কবি অক্ষয়- 
কীর্তি কৃত্তিবাসের জন্মভূমি এই ফুলিয়া। ঠাকুর হরিদাসের 
শাস্তিপুরে অবস্থানকালে তাহার স্থনাম শুনিয়া ফুলিয়া-সমাজের 
ব্রাহ্মণগণমধ্যে অনেকে তাহাকে দর্শন করিতে যাইতেন এবং 
তাহার ভজন শুনিয়। প্রাণে শান্তিলাভ করিতেন। অধুনা 
ভাহাকে স্বগ্রামে পাইয়া সকলেই বিশেষ আনন্দিত হইলেন । 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৫৩ 


তাহাদিগের বিশ্বাস জন্মিল যে, হরিদাস ঠাকুর যথার্থ সাধু, 
যথার্থ ভক্ত । 
ফুলিয়ার ব্রাহ্মণ-পপ্ডিতগণের মধ্যে ষাহার! ঠাকুর হরিদাসকে 
একটু বিশেষ শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিতেন, রামদাস পণ্ডিত 
তাহাদিগের মধো একজন। ইনি স্থপপ্ডিত, ধর্্মশান্ত্রবেত্া ও 
ধন্মপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। ঠাকুরকে দেখিয়া তাহার প্রতি 
ব্রাহ্মণের একান্ত ভক্তি জন্মিয়াছিল। ব্রাঙ্ষণ একদিন বিনীত- 
ভাবে হরিদাসকে বলিলেন,_মহাশয়, আপনি সাধু, আপনার 
এস্বানে আগমনে আমরা ধন্য হইলাম । না জানি, এ গ্রামের কত 
পুর্বব-্থুকৃতি ছিল। যেস্থানে একজন সাধুব্যক্তি বাস করেন, 
সে স্থান পবিত্র হইয়৷ যায়। আপনি দয়া করিয়া আসিয়াছেন, 
বড়ই আনন্দের কথা । এ স্থানে কিছুকাল বাস করুন ।” 
হরিদাস ঠাকুর বলিলেন,_-“দ্বিজবর ! আমাকে যে ওরূপ 

বলিতেছেন, ইহাতে আমি নিতান্ত সঙ্কুচিত হইতেছি। আমি 
অস্পৃশ্য, নীচ জাতি । আপনারা ব্রাহ্মণ । বেদ বলেছেন যে, 
ব্রাহ্মণ বিষুকলেবর। আমি যে আপনাদিগের সঙ্গ পাইলাম, 
ইহা! আমার পরম সৌভাগ্য ।” 

ব্রহ্ম হরিদাস কহে-_ওহে দ্বিজবর, 

বেদোক্তি ব্রঙ্ষণ মাত্রে বিষ্ুকলেবর । 

মুঞ্রঃ নীচ জাতি হউ নহে স্পর্শ যোগ্য, 


তুয়।! সঙ্গ পাইন্ুু মোর এই মহাভাগ্য ।” 
(শ্রী অঃ প্রঃ) 


৫9 ঠাকুর হরিদাস 


পণ্ডিত রামদাস বলিলেন,_-“মহাশয় ! আপনি।/পরম ঈশ্বর- 
ভক্ত, সাধু । আপনি এই প্রকার দৈন্য গত কেন ? 
যিনি ঈশ্বরানুরাগী, তাহার জাতির গণনা হয় না। :স্পর্শমণির 
স্পর্শ পাইলে যেমন লৌহ স্বর্ণ হইয়া! যায়, তন্রপ বাহার সহিত 
ঈশ্বরোপাসনার সংযোগ হইয়াছে, তাহার ষে বর্ণ ই হউক না কেন, 
তিনি শ্রেষ্ঠ ।” 


“রামদাস কহে সাধু কাছে কর দৈন্, 
ঈশ্বরান্নরাগী জনের জাতি নহে গণ্য । 
'যৈছে স্পর্শমণির স্পর্শে লৌহ হয় স্বর্ণ, 
ঈশ্বরোপাসনে তৈছে শ্রেষ্ঠ সর্ববর্ণ 1” 

( শ্রীঅঃ প্রঃ) 


ইহার পর উভয়ের মধ্যে জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ সম্বন্ধে 
অনেক কথ। হইল। ঠাকুর হরিদাস সর্বশেষে বলিলেন যে, 
যিনি সর্বেবশ্বর, সেই শ্রীভগবান্কে লাভ করিতে হইলে, একমাত্র 
ভক্তিই তাহার পন্থা । জ্ঞানযোগে নিরাকার নির্বিবশেষ 
্রহ্মজ্যোতিঃ মাত্র অনুভূত হয়। কিন্তু সর্বশক্তিমান, সর্ববমা ধুর্ধ্য- 
পুর, সচ্চিদানন্দবিগ্রহ ভগবান্কে ভক্তি ভিন্ন পাওয়া যায় না। 
ভস্তিলাভের উপায় হরিনাম। অবিশ্রান্ত হরিনাম-জপে প্রেমধন 
লাভ হইয়া থাকে। 


ক্ত্রহ্ম হরিদাস কহে ভক্ভিযোগ সার, 
তাহে লভ্য হয় নিতাব্রহ্ম সর্বেখর | 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৫৫ 
নিত্য ব্রন্মবস্ত হয় স্বয়ং ভগবান্‌, 
সচ্চিৎ আনন্দময় সর্বশক্তিমান্। 
ভরিনাম হয় শুদ্ধভক্তির কাবণ, 
অবিশ্রান্ত জপে পাত্র নিত্য প্রেমধন।” 


( শ্রীঅঃ প্রঃ) 


পণ্ডিত রামদাসের মনে ঠাকুর হরিদাস সম্বন্ধে প্রথম 
দর্শনেই একটা ধারণা জন্মিয়াছিল যে, ইনি একজন অসাধারণ 
ব্যক্তি, সিদ্ধ মহাপুরুষ । স্থতরাং ঠাকুরের কথ! ব্রাহ্মণ অক্ষরে 
অক্ষরে বিশ্বাস করিলেন। হরিদাস ফাঁক কথা কহেন নাই। 
প্রত্যেক কথাই তাহার নিজের প্রত্যক্ষ কথা । এজন্য তাহার 
প্রতি কথায়ই শক্তি ছিল। সেই শক্তির সঞ্চারে ব্রাহ্ধণ 
রোমাঞ্চিত-কলেবরে ঠাকুর হরিদাসের স্থানে দীক্ষা প্রার্থনা 
করিলেন। কিন্তু যিনি তৃণাদপি স্থুনীচ, যিনি সকলের নিকট 
হাত যোড় করিয়াই আছেন, এমন যে বিনয়ের বিগ্রহস্বরূপ 
হরিদাস ঠাকুর, তিনি কি একজন স্থবির, শান্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণকে 
মন্ত্র দিতে-_তীাহার গুরু হইতে স্বীকৃত হইবেন ? ইহা ধারণা- 
যোগ্য নয়। কিন্তু ঠাকুর সেই স্থলেই এবং সেই ক্ষণেই 
কি এক ভাবের আবেশে ব্রাহ্ষণকে শক্তিসঞ্চার পুর্ববক হরিনাম 
প্রদান করিলেন । 


“শুনি দ্বিজ হঞা রোমাঞ্চিত-কলেবর, 
কহে মোরে দয়! করি করহ সংস্কার। 


৫৬ ঠাকুর হরিদাস 
তাহা শুনি হরিদাস প্রমে পূর্ণ হঞা, 
হরিনাম দিল! দ্বিজে শক্তি সঞ্চারিয়া |” 
(শ্রীঅন প্রঃ) 


সাধুমহাপুরুষদিগের চেষ্টা-চরিত্র, গতিবিধি সাধার্ণ মনুষ্কের 
বুদ্ধির অনধিগম্য। নিজ্ভন স্থানই ঠাকুর হরিদাসের প্রিয়, 
এবং নিজ্জনে রহিয়াই তিনি আপন কুটারে বসিয়া নিরন্তর 
হরিনাম জপ করিতেন, এত দিন আমরা তাহাই দেখিয়াছি । 
ফুলিয়ায় আনিয়া কিন্তু কিছুকাল পরেই তীহার ভাবান্তর 
উপস্থিত হইল। এখন হইতে তিনি আপনাকে সম্পূর্ণরূপে 
ছাড়িয়া দিলেন। হরিদাস ঠাকুর কখনও ফুলিয়ায়, কখনও বা 
শীস্তিপুরে, এইরূপে নিরবধি স্থুরধুনীর তীরে তীরে হরিনাম 
কীর্তন করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। ঘুরিতে ঘুরিতে যখন 
শ্রীঅদ্বৈত প্রভুর সহিত আসিয়া মিলিত হন, তখন উভয়ে কৃষ্ণ- 
প্রেমানন্দে আত্মহারা হইয়া উন্মন্তের ন্যায় নৃত্য করেন এবং 
এমন কুষ্কীর-গর্জন করেন যে, তাহাতে যেন গোলোকের আসন 


পধ্যন্ত টলিয়া উঠে, আর স্থরতরঙ্গিণী কোটি তরঙ্গ বিস্তার 
করিয়া যেন আপনার আনন্দ প্রকাশ করিতে থাকেন । 


“নরবধি হরিদাস গঙ্গাতীরে তীরে, 
ভ্রমেণ কৌতুকে কৃষ্ণ বগি উচ্চৈংস্বরে । 
পাইয়া তাহার সঙ্গ আচাধ্য গোসাঞ্রি, 
হুন্কার করেন আনন্দের অন্ত নাই। 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৫৭ 


হরিদাস ঠাকৃব অদ্বৈতদেব সঙ্গে, 
ভামেন গোবিনা-রস-সমুদ্র তরঙ্গে |” 
( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 
হরিদাস ঠাকুর পরম ত্যাগী, পরম বৈরাগী--বৈরাগীর 

শিরোমণি, নিক্ষাম-ভক্তিযোগী । অফষ্টপ্রহব গোবিন্দ নাম মুখে 
উচ্চাবিত হইতেছে, ক্ষণেকেব তরে তাহাব বিরাম নাই। 
হরিনামগ্রহণের,হরিনামকীর্তনের চরম ফল যে অকৈতব কৃষ্ণপ্রেম, 
তাহা তাহার লাভ হইয়াছে । নাম করিতে করিতে অফষ্ট 
সান্বিক ভাব আসিয়া তাহার দেহ-মন আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে-_ 
তিনি আর স্ববশে থাকেন না। তাহার প্রাণের ভিতরে যে 
কি হয়, তাহ! তিনিই জানেন, কিন্তু লোকেরা দেখে যে, তিনি 
কখনও নৃত্য, কখনও ক্রন্দন, কখনও গভীর গর্জন, আর 
কখনও বা অট্রহাস্থ করিতেছেন! এইরূপে শ্রীকু্জ-কীর্তনে উন্মত্ত 
হইয়! ঠাকুর হরিদাস ফুলিয়। গ্রামে কালযাপন করিতেছেন । 

“কখন করেন নৃত্য মাপনা আপনি, 

কখন করেন মত্ত সংহপ্রার ধ্বনি । 

কখন ব! উচ্চৈ€ম্বরে করেন রোদন, 

অট্ট অট্র মহ! হাস্ত হাসেন কখন। 

অশ্রুপাত, রোমহ্র্ষ, হাস্তা, মুচ্ছা। ঘর্্ম, 

কৃষ্চভক্তিবিকারের যত আছে মর্ম । 

প্রভূ ভরিদাস মাত্র নৃত্যে প্রবেশিলে, 

সকলি আসিয়! তার শ্রীবিগ্রহে মিলে |” 

( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


৮ ঠাকুর হরিদাস 
কাজীর অত্যাচার 


তখনকার দিনে স্থানে স্থানে বিচারকর্তী ছিলেন কাজী। 
“কাজীর বিচার” বলিলে আজকাল লোকেরা যাহা বুঝে, 
তখনকার কাজীর বিচার ঠিক তেমনই ছিল। তখন নবদ্বীপের 
কর্তা ছিলেন চাদ কাজী, আর শান্তিপুরের দগু-মুখ্ডের বিধাতা 
ছিলেন গোড়াই কাজী | ঠাকুর হরিদাস মুসলমান ধণ্রে জলাঞ্জলি 
দিয়া এক্ষণে হিন্দুর ধন্ম আচরণ করিতেছেন, বিশেষতঃ কাজী 
সাহেবের নিজের এলাকার মধ্যেই আসিয়া এতটা বাড়াবাড়ি 
করিতেছেন, গোড়াই কাজীর তাহা সহ্য হইল না। হরিদাস 
ঠাকুরকে অতি গুরুতর শাস্তি দিবার জন্য কাজী একেবারে 
গৌড়ে যাইয়া বাদশাহের নিকট তীহাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ 
উপস্থিত করিলেন । অভিযোগের মন্ম এই যে-_ 


“গঙ্গা্ান করি নিরবধি হরিনাম, 
উচ্চ করি লইয়! বুলেন সর্বস্থান। 
যঝন হইয়া করে হিন্দুর আচার, 
ভাল মতে তারে আনি করহ বিচার ।” 
( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


গৌড়াধিপতি হোসেন শাহা এই অভিযোগ শুনিবামাত্র 
ক্রোধে অধীর হইলেন, এবং আপনার খাস-দরবারেই হরিদাসের 
বিচার করিবেন বলিয়। ইন্তাহার জারি করিলেন। ইহার কয়েক 
'দ্বি্ পরেই ঠাকুর হরিদাসকে ধরিয়া লইয়া যাইতে ফুলিয়ায় 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৫৯ 


পাইক-বরকন্দাজ আমিল। যিনি সকল ছাড়িয়। শ্রীগোবিন্দ- 
চরণারবিন্দ আশ্রয় করিয়াছেন-_-গোবিন্দচরণে স্থিতি লাভ 
করিয়াছেন, তাহার আবার কিসের ভয়? পাইক-বরকন্দাজ, 
কাজী-বাদশার কথা দুরে থাকুক, যমের ভয়ও তিনি রাখেন না । 
নিত্য-যুক্ত হরিদাস ঠাকুর কৃষ্ণনাম উচ্চারণ করিতে করিতে গুহ 
হইতে বহির্গত হইলেন, পাইকের! তাহাকে ধরিয়া লইয়া চলিল, 
ফুলিয়া গ্রাম বিষাদে ডুরবিল। এই সময়ে অদ্ৈতপ্রভু বোধ 
হয় নবদ্ীপে । 

“কৃষ্ণের প্রসাদে হরিদাস মহাশয়, 

যবনের কি দায় কালের নাহি ভয়। 

কুষ্ণ কৃষ্ণ বলিয়া চলিল! সেইক্ষণে, 

মুলুকপতির আগে দিল দরশনে 1” 

( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


হরিদাস ঠাকুর যে দ্রিন গৌড়ে পৌছিলেন, সে দিন তীহাকে 
বন্দিখানায় রাখা হইল। পরদিন তীহার বিচার। নানা 
শ্রেণীর বন্দিগণ বন্দিশালাঁয় রহিয়াছে । তাহারা সকলেই ঠাকুর 
হরিদাসের অসামান্য উজ্জ্বল দেহ-প্রভা দেখিয়া তাহার পানে 
একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল। তাহার দর্শন-প্রভাবে ও তীহার 
মুখের হরিনাম শ্রবণে মহামহা অপরাধীদিগেরও প্রাণ তক্তিরসে 
সিক্ত হইল। তাহার! যে কারাগারে রহিয়াছে, ক্ষণেকের' তরে সে 
কথা ভুলিয়া গেল, চিত্তে বিমল আনন্দ অনুভব করিতে লাগিল । 
বন্দিগণ আপন আপন স্থানে রহিয়াই ঠাকুরকে প্রণাম করিল। 


৬০ ঠাকুর হরিদাস 
আজানুলম্বিত-ভুজ কমল-নয়ন, 
সর্ব-মনোহর মুখ-চন্ত্র অনুপম । 
ভক্তি করি সবে করিলেন নমস্কার, 


সবার হইল কৃষ্খ-ভক্তির বিকাব 1” 
( শ্রীচৈঃ ভাঃ ) 


যাহারা কিছুদিন পূর্বে পরের মাথায় লাঠি মারিয়াছে, কেহ 
বা জাল-জুয়াচুরি করিয়া অপরের সম্পত্তি গ্রাস করিবার চেষ্টা 
করিয়াছে, এমন বিভিন্ন শ্রেণীর অপরাধিগণেরও চিত্ত তৎকালে 
তক্তিরসে বিগলিত হইতে দেখিয়া! ঠাকুর হরিদাস আনন্দিত 
হইলেন এবং প্রাণে প্রাণে সকলকে এই বলিয়া আশীর্ববাদ 
করিলেন যে, আর যেন ইহারা বিষয়-পঙ্কে নিমগ্ন না! হয় এবং 
ইহাদিগের প্রাণের এই নিপ্নল অবস্থা, এই ভক্তির ভাব যেন 
স্থায়ী হয়। কিন্তু প্রকাশে একটু বঙ্গ করিয়া বলিলেন-_ 
“তোমরা এখন যে ভাবে আছ, সকলে সেই ভাবেই থাক।” 


“থাক থাক এখন আছহ ষেরূপে, 
গুপ্ত আশীর্বাদ করি হাসেন কৌতুকে 1” 
( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


এই ঘটনা! হইতেই বুঝা যায় যে, হরিদাস ঠাকুর বড় রঙ্গী 
ছিলেন ।' সদানন্দ পুরুষ, কারাগারে আসিয়াও রঙ্গ । বন্দিগণ 
ঠাকুর হরিদাসের কথার প্রকৃত ভাব বুঝিতে না পারিয়া তাহার 
আশীর্ববাদকে অভিসম্পাত জ্ঞান করিয়া একান্ত বিষগ্ন হইল । 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ হিঃ 


ঠাকুর হরিদাস ধরদিগের মুখের ভাব দেখিয়াই সমস্ত 
ঝিতে পারিলেন এবং সং হী পি 
“ধন্দী থাক হেনঈআশীবব। ্বাহি করি, 
ব্বিয় পাসর, অহনিশ বণ হাঁ 
এবে কঞ্টগ্লীতে তোম৷ সবাকার ম, 
যেন আছে, এই মত থাকুক সর্বক্ষণ। 
ছলে করিলাম এহ গুণ্ত আশীব্বাদ, 
তিলাদ্ধেক না! ভাবিভ তোমরা [বষাদ ।৮ 
( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 
গৌডের দববারে 


আমরা পূর্বেই বলিয়া্ছি যে, ঠাকুব হরিদ্রাসের চেহারাতে 
অসাধারণ কিছু ছিল--একট। অসাধাঁবণ ব্যক্তিত্ব ছিল। তাঁহাকে 
দেখিবামাত্র মহা বিবোধী লোকের প্রাণও আপনা হইতেই 
সন্রমে নত হইত। মুলুকের অধিপতি হোসেন শাহা আজ 
পুরা দরবারে স্টজীর, নাজীব, মোল্লা, মৌলবী ও দেশের বড় বড় 
কাজী ও মন্ত্রিবর্গে পবিবৃত হইযা বিচারাসনে উপবিষ্ট । আজ 
ঠাকুর হরিদাসের বিচাব হইবে। সে বিচার দেখিবার জন্য 
দ্বারগৃহ লোকে লোকারণ্য। এঁ যে হরিদাস ঠাকুর আসিতে- 
ছেন-_-বদনমগুলে অপুর্ব জ্যোতি মুখে অবিরাম তারকক্রহ্গ- 
নাম। সেই অসাধারণ বন্দী আপন প্রভাবে সকলের চিত্ত 
চমকিত করিয়া বিচার-মঞ্চে উপনীত হইলেন। কিন্তু ষড় 
বিস্ময়ের কথা যে, হোসেন শাহ! তাঁহাকে সম্মানের সহিত আপন 


ঠাকুর হরিদাস 


পার্থে আনিয়া উত্তম আসনে উপবেশ” করাইলেন। দরবার 
শুদ্ধ লোক স্তস্তিত। 
“অতি মনোঁহন তেজ দেখিয়া তাহান, 
পরম গৌক্*ব বসিবারে দিলা! স্থান ।” 
(শ্রীচৈঃ ভাঃ) 
মুলুকের - তি বোকা! ছিলেন না। হোসেন শাহা উত্তমরূপে 
বুঝিতেখারা ঝ্রিছিলেন যে, এই আসামী সাধারণ ব্যক্তি নহেন। 
উর হাঠুল-ভ্যতি কঠোর শাস্তিবিধান করিলে সহজ সহত্র লোক 
সরকারের বিরোধী হুয়া দাড়াইতে পারে । কিন্তু যদি মিষ্ট 
কথায় বলিয়া-কহিয়া তাহার মন ফিরান যায়, যদি তিনি 
প্রায়শ্চিতম্বরূপ কলমা পড়িয়া পুনরায় পবিত্র যবনৎধ্ষ্ম গ্রহণ 
করেন, তাহ! হইলেই সর্ব্বোত্তম হয়। প্রথমে সেই নীতিই 
অবলম্বন করা কর্তব্য । তাহাতে যদ্দি তাহার মতিগতি না 
ফিরে, তবে শাস্তি দেওয়া ত নিজের হাতেই আছে। তাই 
তিনি ঠাকুর হরিদীসকে আপন বুদ্ধি অনুসারে বুঝাইয়া-শুঝাইয়া 
অনেক কথা বলিলেন। 
“আপনে জিজ্ঞাসে তারে মুলুকের পতি-_ 
কেন ভাই তোমার কিরূপ দেখি মতি ? 
কত ভাগো দেখ তুমি হঞাছ যবন, 
তবে কেন হিন্দুর আচারে দেহ মন? 
আমরা হিন্দুরে দেখি নাহি থাই ভাত, 
তাহ ছাড় হই তুমি মহাবংশ-জাত। 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৬৩ 


জাতি-ধর্ম লজ্বি কর অন্ত ব্যবহার, 
পরলোকে কেমনে বা পাইবে নিস্তার ? 
না জানিয়া যে কিছু করিলা অনাচার, 
সে পাপ ঘুচাভ করি কলমা উচ্চার ৷” 
( গ্রীচৈঃ ভাঃ) 
মায়া-মোহিত মুলুকপতির কথায় হাস্য করিয়া ঠাকুর হরিদাস 
বলিলেন--“অহো। ! বিষু্মায়া !” 
“শুনি মায়া-মোহিতের বাক্য হরিদাস, 
অহো! বিষুমায়া বলি চৈল মহা! হাস।» সানি 
ধর্মে ধর্মে এত বিরোধ ! মতান্তরে এত মন্‌- আমার 
এক নিত্য সত্য অখণ্ড অব্যয় পুরুষ, স৮।এ৭ পুর্ববক পুনরায় 


করে, সেই একেরই আরাধনা করে। নাদর্শদণ্ডে দণ্ডিত করা 
সেই এক অবাক্ত ” "পর মান-সম্ম আর থাকিবে না।” 


ভি হারাবেন এরর বলিতেছিলেন, তখন হোসেন 
আবরার নিই গিয়াছিল। প্রাণে একটু কোমলভাবও 
নে হাঁবার গোড়াই কাজীর উত্তেজনাপুর্ণ বাক্যে 
হি করাটা বত অন্যদিকে ফিরিল। এবারে তিনি নরম- 
ইত্যাকার সা্প্রাদারাইয়া" একটু শাসাইয়।৷ বলিলেন-__ 


ইহা ভাবিয়াই হালে মুলুকেব পতি--মারে ভাই, 
বিষুমায়া 1” অত শান্ত বল, তবে চিন্তা নাই। 
ওজস্বিনী ভারা করিবে শান্তি সব কাজীগণে, 


ম, পাছে আর লঘু হবে কেনে?” 


উপবেশন করিলে, 
৮৪ ( শ্রীচৈঃ ভা) 


৫ 


৬৪ ঠাকুর হরিদাস 


প্বলিতে লাগিল তাঁরে মধুর উত্তর, 

শুন বাপ, সবারই একই ঈশ্বর । 

নাম মাত্র ভেদ করে হিন্দু যবনে, 

পরমার্থে এক কহে কোরাণে পুরাণে । 

এক শুদ্ধ নিতা বস্তু অথণ্ড অব্যয়, 

পরিপূর্ণ হৈয়া বৈসে সবার হৃদয় । 

সেই প্রভূ যারে যেন লওয়ায়েন মন, 

সেইমত কর্ম করে সকল ভুবন । 

সে প্রভুর নাম গুণ সকল জগতে, 
সরকারের , বলেন সকল মাত্র নিজ শাগ্রমতে ৷” 
কথায় বলিয়া-ক। ( আ্রীচৈঃ ভাঃ) 
প্রায়শ্চত্তম্বরূপ কলম 
করেন, তাহা হইলেই রঃ বলিলেন_-“ধিশি তোমার আমার 
অবলম্বন করা কর্তব্য। তাহাতে যদি বিয়া যেমন প্রেরণা 
ফিরে, তবে শাস্তি দেওয়া ত নিজের ইহাতে এ জানার 
তিনি ঠাকুর হরিদাসকে আপন বুদ্ধি অনুসাটীর করিয়া আমাকে 


2? 
অনেক কথা বলিলেন। রি 
ৰব তারতম্য আছে । 
“আপনে জিজ্ঞাসে তারে মুলুকের প 
উচ্চারণ করি, তখন 


কেন ভাই তোমার কিরূপ দেখি মত্ডি 
কত ভাগো দেখ তুমি হএগছ যবন,কাথায় উড়িয়া যায়। 
তবে কেন হিন্দুর আচারে দেহ মন 1 রসনায় উচ্চারিত 
আমরা হিন্দুরে দেখি নাহি খাই ভাত, গুরুর গুরু হইয়া 
তাহ ছাড় হই তুমি মহাবংশ-জাত। ॥র করে। ঠাকুর 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৬৫ 


হরিদাস বলিয়াছিলেন কেবলমাত্র এ কয়েকটি সাধারণ সত্যকথা। 
কিন্তু তাহার কথায় শক্তি ছিল। তীহার কথা শুনিয়া যবনের৷ 
মোহিত হইল। স্বয়ং মুলুকপতিও যেন একটু সন্ভোষের ভাব 
ব্যক্ত করিলেন । ভাব-গতিক দেখিয়া আমাদের সেই গোড়াই 
কাজী মহাশয় বড়ই অস্থির হইয়া পড়িলেন। ভাবিলেন- এই 
বুঝি শীকার পলায়, বুঝি বা আসামী খালাস পায়। এ পাপী 
অব্যাহতি লাভ করিলে এই এক দুষ্টে কত জনকে দুষ্ট করিবে, 
পবিত্র ববন-কুলে কলঙ্ক আনয়ন করিবে । কাজী অতিশয় দৃঢ়তার 
সহিত মুলুকপতিকে বলিলেন-__“বাদশানামদার ! আমার 
নিবেদন এই ষে, হয় এ ব্যক্তি কলমা উচ্চারণ পূর্ববক পুনরায় 
যবন-ধন্মে প্রবেশ করুক, না হয়, ইহাকে আদর্শদণ্ডে দণ্ডিত করা 
হউক । তাহ। না হুইলে যবনের মান-সন্ত্রম আর থাকিবে না।” 
হরিদাস ঠাকুর খন কথা বলিতেছিলেন, তখন হোসেন 
শাহার তাহা ভাল লাগিয়াছিল। প্রাণে একটু কোমলভাবও 
আসিয়াছিল। কিন্তু আবার গোড়াই কাজীর উত্তেজনাপুর্ণ বাক্যে 
বাদশাহের মনের গতি অন্যদিকে ফিরিল। এবারে তিনি নরম- 
গরম স্থুরে একটু সমজাইয়া, একটু শাসাইয়া বলিলেন-_ 
“পুনঃ বলে মুলুকের পতি--মারে ভাই, 
আপনার শাস্ত্র বল, তবে চিন্তা নাই। 
অন্যথা, করিবে শাস্তি সব কাজীগণে, 
বলিলাম, পাছে আর লঘু হবে কেনে ?” 
( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 
৫ 


৬৬ ঠাকুর হরিদাস 


ঘবন-রাজার চক্ষে ঠাকুর হরিদাসের অপরাধ অতি গুরুতর । 
তাহাতে আবার শাস্তি দিবেন কাজীর দল মিলিয়া । অর্থাৎ দর- 
বারে উপস্থিত কাজীরা যে দণ্ড নিদ্ধারিত করিবেন, তাহাই ঠাকুর 
হরিদাসকে ভোগ করিতে হইবে । স্থতরাং নিশ্চয়ই প্রাণ-দ 
অথবা। তত্ুল্য কোনও একটা দণ্ডের ব্যবস্থা হইবে, এই সহজ 
কথাটা হরিদ্বাদ ঠাকুর অবশ্যই বুঝিতে পারিয়াছিলেন। কিন্তু সেই 
ভাবনা ভাবিয়া তিনি কিছুমাত্র বিচলিত হইলেন না। প্রাণের 
ভয়ে হরিনাম ছাড়িয়া! কলম। পড়িতে হইবে-_-তোবা তোবা বলিতে 
হইবে, ইহা! কি ঠাকুর হরিদাসের দ্বারা সম্ভবে ? প্রাণ ছাড়া বায়, 
কিন্তু হরিনাম ছাড়া যায় না, ইহাই হরিদাস ঠাকুরের প্রাণের 
কথা । মহাপুরুষদিগের চিত্ত এক দ্দিকে যেমন কুস্থম হইতেও 
হ্ুকোমল, তব্রপ অন্যদিকে ব্জাপেক্ষাও কঠোর । ষাহারা ভাবেন 
যে, কৃষ্ণতক্ত হইলেই মানুষ ভীরু কাপুরুষ হয়, তাহাদিগকে আর 
কি বলিব, তাহার! নিতান্তই ভ্রান্ত, বোধ হয়, তাহারা কৃষ্ণভক্ত 
দেখেন নাই । প্রকৃত কৃষ্তভক্ত একদিকে যেমন তৃণাদপি স্তুনীচ, 
তেমনই আবার অপরদিকে সাক্ষাত তেজের বিগ্রহ-_জ্বলস্ত 
পাবক। ভক্ত প্রহলাদের কথ! স্মরণ করুন। যিনি মহান্‌ 
হইতেও মহান্, গরীয়ান্‌ হইন্ডেও গরীয়ান্, সেই পুণণত্রহ্ম 
প্রীগোবিন্দের অভয়পদে যিনি আত্মসমর্পণ করিয়াছেন, তাহার 
আবার ভয়? 

সেই ব্রহ্মভূত প্রসন্নাত্মা নির্ভীক হরিদাস ঠাকুর মহাতেজের 
সহিত মুলুকপতির কথার উত্তরে বলিলেন__ 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৬ 
“খওড খণ্ড যদি হই--_যায় দেহ প্রাণ, 
তবু আমি বদনে ন! ছাড়ি হরিনাম |” 
( শ্রাচৈঃ ভাঃ) 


বৈষ্ণবের তেজ দেখিয়! দরবার শুদ্ধ লোক স্তস্তিত হইল। 
ঠাকুর হরিদাসের কণ্ট-নিঃস্যত সেই গম্ভীর ধ্বনি সর্বব-চিত্ত চমকিত 
করিয়া তাহাদিগের কানে ও প্রাণে যাইয়া প্রতিধবনিত হইতে 
লাঁগিল-_ 
“থণ্ড থও যদি হই যায় দেহ প্রাণ, 
তবু আমি ব্দনে না ছাড়ি হরিনাম ।” 
(শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


মুলুকপতির মুখের উপর এত বড় জোরের কথা আজ 
পধ্যস্ত আর কেহ বলে নাই। বলা বান্ুল্য যে, হোসেন শাহ 
হরিদাস ঠাকুরকে অতি কঠোর শান্তি দিতে কৃতসংকল্প হইলেন 
এবং কাজীগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন,__“এমন ব্যক্তিকে 
আপনার এক্ষণে কি দণ্ড দিতে ইচ্ছা করেন ?” কাজীগণের 
মুখপাত্র জবরদস্ত গোড়াই কাজী দীড়াইয়া! বলিলেন-__-“আমাদের 
বিচারে এই কাফেরের উপযুক্ত দণ্ড এই হয় যে, এই ব্যক্তিকে 
একে একে বাইশটি বাজারে লইয়া গিয়া প্রত্যেক বাঁজারে সর্বব- 
সমক্ষে মনের ঝাল মিটাইয়৷ ইহার কেশাগ্র হইতে নখাগ্র 'পর্যযস্ত 
অবিশ্রাস্ত বেত্রাঘাত কর! এবং এই প্রকারেই ইহার পাপজীবনের 
অবসান করা। বাইশটি বাজারে প্রহার খাইয়াও যদি না মরে, 


৬৮ ঠাকুর হরিদাস 


হা, তবে বুঝিব যে, এ ব্যক্তি জ্ঞানী বটে, এ যাহা বলে, 
তাহা সত্য ।” 

মুলুকপতি কাজীর রায়েই রায় দিলেন, এবং) যমদুতের 
মুন্তিম্বরূপ পাইকদ্দিগকে ডাকিয়া তর্জন গর্জন ৪ বলিয়া 
দিলেন,-__ইহাকে বাইশ বাজারে লইয়া গিয়া এমন প্রহার 
করিবে, যেন প্রহারে প্রহারেই ইহার প্রণাবায়ু বহির্গত হয়। 
যবন হইয়া! যে ব্যক্তি হিন্দুয়ানি করে, এইরূপ শোচনীয় মৃত্যুই 
তাহার প্রায়শ্চিত্ত ।% 

পাইকেরা পুর্বব হইতেই উত্তেজিত হইয়া কেবল. একটা 
হুকুমের অপেক্ষা করিতেছিল। হুকুম পাইবামাত্র, মনের আক্রোশ 
মিটাইয়া উহা! তামিল করিবার নিমিত্ত উহার ঠাকুর হরিদাসকে 
দৃঢরূপে রজ্জু দিয় বাঁধিয়া বাজারের দিকে লইয়া চলিল। ইহার 
পর যে লোমহর্ষণ পৈশাচিক কাণ্ডের অভিনয় হইতে লাগিল, 
সেই মন্মবিদারিণী ব্যথার কাহিনী বর্ণন করিতে লেখনী অক্ষম | 


্রীল বুন্দাবনদাস লিখিয়াছেন-_ 


“বাজারে বাজারে সব বেড়ি হুষ্টগণে, 
মারয়ে নি্গাব করি মহা! ক্রোধমনে | 
কষ কৃষ্ণ ম্মরণ করেন হরিদাস, 
নামানন্দে দেহে তুঃখ না হয় প্রকাশ। 
দেখি হরিদাস-দেহে অতাস্ত প্রস্থার, 
স্রজন সকল ছঃখ ভাবেন অপার। 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৬৯ 
কেহ বলে অনিষ্ট হইবে সর্বরাজ্া, 
সে নিমিত্ত স্থজনেরে করে হেন কাধ্য, 
রাজা-উজীরেরে কেহ শাপে ক্রোধ-মনে, 
মারামারি করিতেও উঠে কোন জনে । 
কেহ গিয়া যবনগণের পায়ে ধরে, 
কিছু দিব, অল্প করি মারহ উহারে। 
তথাপিও দয়া নাহি জন্মে পাপিগণে, 
বাজারে বাজারে মারে মহা ক্রোধমনে 1” 


( শ্রীচৈঃ ভাঃ ) 


ঠাকুর হরিদাসের প্রতি এই প্রকার অমানুষিক অত্যাচার 
দেখিয়া শত-সহক্ম লোক হায় হায় করিতে লাগিল, সকলের 
প্রাণ বিদীর্ণ হইতে লাগিল। তাহারা যবনগণের পায়ে পড়িয়া 
কত কাকুতি-মিনতি করিয়া বলিল,_-“তোমাদ্িগকে অর্থ দিব, 
তোমরা ঠাকুরকে কিছু কম করিয়া মার।” কিন্তু পাইকের৷ 
আরও জোরে বেত চালাইতে লাগিল। কিন্ত্রু ধীহাকে এত 
করিয়! মারিতেছে, তাহার অবস্থা কি? তিনি এত প্রহারে 
কেমন করিয়! বাঁচিয়া আছেন আর কেমন করিয়াই বা এরূপ 
নির্মম বেত্রাঘাত সহিতেছেন ? প্রতি আঘাতে রক্ত ছুটিতেছে, 
আর সেই প্রতি শোণিতবিন্দু হরিদাস ঠাকুরের শ্রীঅঙ্গের 
কনক-কান্তিতে উজলিয়া যেন হাসিয়৷ বলিতেছে__ 


“থণ্ড খণ্ড যদি হই যায় দেহ প্রাণ, 
তবু আমি বনে না! ছাড়ি হরিনাম ।” 


৭৬ ঠাকুর হরিদাস 


এত প্রহারেও ঠাকুর হরিনাম ছাড়েন নাই! এ দেখ, 
পাষণ্ডের৷ কেমন করিয়া ঠাকুরকে মারিতেছে! 'আর দেখ, 
ঠাকুর এখনও কেমন প্রসন্ন-বদনে হরিনাম করিতেছেন! ঠাকুর 
হরিদাস কৃষ্ণের প্রসাদে নামানন্দে আপনার আত্মাকে যেন 
দেহ হইতে পৃথক্‌ করিয়। লইয়াছেন, প্রাণে কোনও ক্লেশ নাই, 
দুঃখ নাই ! কিন্তু একমাত্র দুঃখ, ইহাদের গতি কি হইবে ?-_ 
হে কৃষ্ণ! করুণাপিন্ধে। ! ইহাদেরে কৃপা কর, ইহাদেরে কৃপা 
কর। ঠাকুর! ইহাদের অপরাধ লইও না-_-কেবল এই 
প্রার্থনা, এই আশীর্ববাদই ঠাকুর হরিদাসের প্রাণে জাগিতেছে ! 
“সবে যে সকল পাপিগণে তারে মারে, 
তার লাগি ত্বঃথ মাত্র ভাবেন অন্তরে । 
এ সব জীবেরে প্রভু করহ প্রসাদ, 
মোর দ্রোহে নহু এ সবার অপরাধ |” 
(শ্রী চৈঃ ভাঃ) 


ক্রোধোন্মত্ত পাইকের! হরিদাস ঠাকুরকে একে একে বাইশ 
বাজারে লইয়। প্রহার করিল, তথাপি তিনি মরিলেন না দেখিয়া 
তাহারা বিস্মিত হইল। এক্ষণে পরস্পর বলাবলি করিতে 
লাগিল--“এ কি, মানুষের প্রাণ রে ভাই? এত মারণেও কি 
মানুষ বাঁচে? যদি মানুষ হইত, তবে ছুই তিন বাজারের 
প্রহারেই মরিয়া যাইত। কি তাজ্জব! বাইশ বাজারে 
ঘুরাইয়া ইহাকে মারিলাম--যার বত শক্তি মারিলাম, তথাপি 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৭৮ 


দেখ, এখনও লে বাঁচিয়া আছে! এখনও সেই হরিনাম 
ছাড়ে নাই ! বুট এই ব্যক্তি গীর হুইবে।” 


না, আরো দেখি হাসে ক্ষণে ক্ষণে। 
€গীর বা সবেই ভাবে মনে |» 
( শ্রী চৈঃ ভাঃ) 
সত্য + : যবন পাইকদের বিশ্বাস জন্মিল যে, ইনি 
তিমানব, হহার মৃত্যু নাই। ইহাতে উহার1 যেমন বিস্মিত, 
তেমনি ভীতও হইল। ভয়ের বিশেষ কারণ এই যে, হরিদাস 
ঠাকুরকে প্রাণে বধ করিতে না পারিলে কাজী সাহেব সকলেরই 
গর্দান লইবেন। তাই প্রাণের ভয়ে-_ 
“যবন সকল বলে-_ওহে হরিদাস! 
তোম। হৈতে আম! সবার হইবেক নাশ। 
এত গ্রহারেও প্রাণ না যায় তোমার, 
কাজী প্রাণ লইবেক আম' সবাকার |” 
( শ্রাচৈঃ ভাঃ) 


হরিদাস ঠাকুর ঘাতকদিগের মুখের পানে প্রসন্ন-দৃষ্টিতে 
চাহিয়া ঈষৎ হাসিয়। কহিলেন-__“আমি না! মরিলে যদি তোমাদের 
মন্দ হয়, তবে এই দেখ, আমি মরিতেছি।” ইহ! বলিয়াই 
ঠাকুর শ্রীগোবিন্দের ধ্যানে আবিষ্ট হইয়া মহাসমাধিস্থ হইলেন। 
তাহার দেহ নিশ্চল নিস্পন্দ হইয়া রহিল! পাইকের! তাহাকে 
স্ৃতড্ঞানে ধরাধরি করিয়া মুলুকপতির দ্বারে নিয়া ফেলিল। 


রি ঠাকুর হরিদাস 
পদেিয়। যবনগণ বিল্রয় হইলা, 
মুলুকপতির দ্বারে লইয়া! ফেলিলা ।, 
(শ্রী ্ঃ ভাঃ) 


সকল আপদ্‌ চুকিল। আর মড়ার উপর খাঁড়া) দিয়া কি 
হইবে? ইহা ভাবিয়াই মুলুকপতি বলিলেন-_-“এখন আর কি, 
ইহাকে নিয়া গোর দাও ।” কিন্তু গোড়াই কাজী তাহাতে 
আপত্তি করিয়া বলিলেন যে, ইহাকে গোর দিলে ত ইহার 
সদগতি হইবে। এব্যক্তি বড় ঘরে জন্মিয়া যেমন নীচ কন্মন 
করিয়াছে, পরকালেও ইহার তেমনিই দুর্গতি হওয়া উচিত। 
অতএব ইহাকে ধরিয়া গঙ্গার জলে নিয়া ফেলিয়া! দিলেই ইহার 
উপযুক্ত সাজা হইবে । 

কাজীর পরামর্শ ই অতি স্থপরামর্শ বলিয়া বিবেচিত হইল । 
পাইকেরা হরিদাস ঠাকুরকে তুলিয়! নিয় গঙ্গায় ফেলিয়া দিল। 
ঠাকুর সর্ববশিবাস্পদ শবের ন্যায় স্থরতরঙ্গিণীর তরঙে তরঙ্গে 
ভামিয়া চলিলেন। যবনেরা বুঝিল না যে, ঠাকুর জীবিত। 
কারণ-_ 


“কৃষ্ণাননসুথসিন্ধুমধ্যে হরিদাস, 

মগ্ন হৈয়াছেন, বাহ নাহিক প্রকাশ। 
কিবা অস্তরীক্ষে কিবা পৃথিবী গঙ্গায়, 
না জান্বন ইব্রিট়াস আছেন কোথায়।” 


( ভ্ীচৈঃ ভাঃ) 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৭৩ 


ঠাকুর হরিদাস স্থখদায়িনী ভাগীরথীর স্থখ-শীতল সলিলে 
ভাসিয়! ভাসিয়৷ চলিলেন, আর তীরে তীরে সহস্র সহত্র লোক 
তাহার অনুগমন করিতে লাগিল। সর্ববসন্তাপহারিণী ঠাকুরের 
ক্ষত-বিক্ষত অঙ্গে যেন তরঙ্গের ছলে আপন কোমল কর বুলাইয়া 
বুলাইয়া তাহাকে সম্পূর্ণ নিরাময় করিয়া দ্িলেন। বহুক্ষণ 
পরে তাহার সমাধিতঙ্গ হইল। সংজ্ঞ্/ লাভ করিয়া তিনি 
তীরে উঠিলেন। 

মৃত ব্যক্তির পুনভ্জাঁবনলাভ ! ইহাতে সেই গঙ্গাতীর যে 
তখন কি প্রকার বিস্ময়-বিজড়িত আনন্দ-কোলাহলে পূর্ণ হইল, 
তাহ! সহজেই অনুমান করা যায়। সদ্দানন্দময় পুরুষ হরিদাস 
ঠাকুর এত নির্যাতনের পরেও প্রফুল্পবদনে হরিনাম করিতেছেন 
এবং শত্রুর বদনপানেও প্রসন্ন-নয়নে চাহিতেছেন, এ দৃশ্য, 
এ দৃষ্টান্ত স্বর্গেও দুল্পভি। সমবেত জনসঙ্ঘ মস্তক অবনত 
করিয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিল এবং গন্তীর উচ্ছাসে মনের 
আনন্দে সহজ্র সহস্র কণ্টে হরিধ্বনি করিয়া গঙ্গার এ কুল 
ওকুল প্রতিধবনিত করিতে লাগিল। যবনগণ এই অদ্ভুত ব্যাপার 
প্রত্যক্ষ করিয়া চিন্তে স্তস্তিত হইল এবং পীরজ্ঞানে ঠাকুরের 
চরণে নিপতিত হইয়া ক্ষম৷ তিক্ষা চাহিল। 


“পীর জ্ঞান করি সবে কৈল নমস্কার, 
সকল ববনগণ পাইল নিস্তার |” 


(গ্রীচৈঃ ভাঃ) 


৭8 ঠাকুর হরিদাস 


মুলুকের পতি এই অত্যাশ্চর্য্য ঘটনার কথা শুনিয়া অবিলম্গে 
সে স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ঠাকুর তাহাকে দেখিয়া 
বালকের ন্যায় হাসিতে লাগিলেন। তখন-_ 


“সন্ত্রমে মুলুকপতি যুড়ি ছুই কর, 
বলিতে লাগিল [কছু বিনয়-উত্তর, 
--সত্য সতা জানিলাম তুমি মহ।পীর, 
এক জ্ঞান তোমার সে হইয়াছে স্থির । 
তোমারে দেখিতে মুঞ্ি আইন্ু হেথারে, 
সব দোষ মহাশয় ক্ষমিবে আমারে। 

' সকল তোমার সম, শত্রু মিত্র নাই, 
তোম। চিনে হেন জন ত্রিভূবনে নাই।” 


( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


ঠাকুর হরিদাস যবনরাজকে আশীর্ববাদ করিয়। ফুলিয়ায় চলিয়! 
আদিলেন। 
“যবনেরে কৃপাদুষ্টি করিয়া প্রকাশ, 
ফুলিয়ায় আইলা ঠাকুর হরিদাস।* 
( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


পুনরায় ফুলিয়ায়। 


ফুলিয়া হইতে হরিদাস ঠাকুরকে ধরিয়া লইয়া যাইবার পর 
যে সকল ঘটন! ঘটিয়াছে, তাহার সমস্ত বৃত্তাস্তই ফুলিয়ায় আসিয়। 
পৌছিয়াছে। অগ্ভ বনু লোকে আসিয়া সংবাদ দিল যে, 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ণ৫ 


হরিদাস ঠাকুর পুনভ্জীবন লাভ করিয়া ফুলিয়ায় ফিরিয়া আসি- 
তেছেন--এই আসিলেন বলিয়া । সে কথা মুহুর্তের মধ্যে মুখে 
মুখে সমস্ত ফুলিয়ায় রটিয়া গেল। ফুলিয়ার স্ত্রী, বুদ্ধ, বালক, 
সকলেই ঠাকুরকে দেখিবার নিমিত্ত গ্রামের বাহিরে ছুটিয়া 
আসিয়া তাহার আগমন-পথে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া চাহিয়া রহিল। 
ফুলিয়া-সমাজের মধ্যে এত দ্রিন যাহার! হরিদাস ঠাকুরকে তেমন 
ভাল চক্ষে দেখিতে পারেন নাই, সগ্ অগ্নি-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ 
সেই খাটা সোনাকে দেখিবাব নিমিত্ত, আজ তাহারাও প্রাণে 
শ্রদ্ধা লইয়৷ আসিয়াছেন ! 

এষে! এধষে তিনি আসিতেছেন-_ভাবে ডগমগ হইয়! 
তেমনিভাবে হরিনাম করিতে করিতে আমিতেছেন ! দেখিতে 
দেখিতে আসিয়া সর্ববসমক্ষে উপস্থিত হইলেন । 


“উচ্চ করি হরিনাম ণইতে লহতে, 
আইলেন হপ্গিদাস ব্রান্গণ-সভাতে। 
হারদাসে দেখি ফুপিয়ার বিপ্রগণ, 
সবেই ভইলা অতি পরানন্দ মন। 
হরিধবনি [বপ্রগণ লাগিল! করিতে, 
হরিদাস লাগলেন আনন্দে নাচিতে। 
স্থির হই ক্ষণেকে বসিল! হরিদাস, 
বিপ্রগণ বসিলেন বেডি চারি পাশ ।” 
( শ্ীচৈঃ ভাঃ) 


হরিদাস ঠাকুর ব্রাহ্মণম গুলীকে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিয়া 


৭৬ ঠাকুর হরিদাস 


শ্িরাসনে বসিয়া মৃছু-মধুর বচনে বলিতে লাগিলেন-_“বিপ্রগণ ! 
আপনার আমার নিমিত্ত কিছুমাত্র দুঃখ করিবেন না। আমি 
সত্য সত্যই অপরাধী । এই পাপ কর্ণে কত গাজা | 
সেই পাপেই আমার এই শান্তি হইয়। গেল। ঈশ্বরের ক্রুপায় অল্প 
শাস্তিতেই আমার গুরুতর পাপের প্রায়শ্চিত হইল, ইহা! আমার 
পরম স্থখেরই কথা ।৮ 

“প্রভু-নিন্দা আমি যে শুনিল অপার, 

তার শান্তি করিলেন ঈশ্বর আমার। 

ভাল হৈল ইথে বড় পাইন সম্তোষ, 

অন্ন শাস্তি করি ক্ষমিলেন বড় দোষ ।” 

( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 
যবন পাইকগণ যখন হরিদাস ঠাকুরকে বন্দী করিয়া লইতে 
ফুলিয়ার় আসিয়াছিল, সেই জময়ে তাহারা ঠাকুরের ভজন- 
কুটারখানি ভাঙ্গিয়া-চুরিয়া ভূমিসাৎ করিয়া গিয়াছিল। এক্ষণে 
ফুলিয়ার লোকেরা তাহার ভজনেব নিমিন্ত গঙ্গা-পুলিনে একটি 
স্থন্দর গোফা নিশ্মাণ করিয়া দিলেন। হরিদাস ঠাকুর কখন 
কখন বিপ্রগণসঙ্গে কীর্তনানন্দে ও অবশিষ্ট কাল সেই নির্জন 
গোফামধ্যে ভজনানন্দে কর্তন করিতে লাগিলেন । 
হরিদাস ঠাকুরের ভজন-স্থান ফুলিয়ার সেই গোফার চি 

অদ্যাবধি বর্তমান আছে। দেশবিদেশের তক্তগণ তথ পর 
ধুলি মন্তকে লইয়! অগ্াবধি হরিদাস ঠাকুরের নামে জাাসিয়! 
করিয়। থাকেন । ফুলিয়া, রাণাঘাট ও শাস্তিপুরের মধ্যবর্তী .যে, 





হরিদাস ঠাকুরের পাট-_ফুলিয়া | 


পঞ্চম পরিচ্ছেদ ৭৭ 


অবশ্থিত। ফুলিয়ার হ্যায় কুলীনগ্রামেও ঠাকুর হরিদাসের পাট 
( ভজন-স্থান ) আছে। নে স্থানে প্রতি বসর অনস্ত-চতুর্দশীতে 
মহোৎসব হইয়া থাকে । কিন্তু হরিদাস ঠাকুর যে কোন্‌ সময়ে 
কুলীনগ্রামে গিয়।ছিলেন, তাহার বিবরণ গ্রন্থপত্রে পাওয়া 
যায না। কুলীনগ্রাম বদ্ধমান জেলার অন্তর্গত। 

এখন হইতে হবিদাস ঠাকুরের গোফার দ্বারে অতিমাত্র 
লোকের ভিড হইতে লাগিল। অপরাহ্ন হইলেই সকলে আসিয়া 
তথায় উপস্থিত হন। শতশত ব্রা্মণ-সভ্জন তথায় বসিয়। 
নামকার্তন শুনেন, পবে গঙ্গায় সায়ংসন্ধ্যা সমাপনান্তে গুহে 
প্রত্যাগমন করেন। কিন্তু কিছু দিন যাবৎ সে স্থানে সকলেই 
একটা অসহ্য জ্বালা অনুভব করিতে লাগিলেন। লোকের! 
আসিয়া বসেন, কিন্তু বেশীক্ষণ তথায় তিষ্ঠিতে পারেন না; 
ঠাকুরের কিন্ত্ব কোনও উদ্বেগ নাই। ব্রাহ্মণের! এই ব্যাপারের 
কারণ অনুসন্ধানের নিমিত্ত বৈদ্য অর্থাৎ সাপের রোজা গণকে 
নিযুক্ত কখিলেন। তাহারা নান! গুণ-জ্ঞান করিয়া বলিল যে, 
গোফার ভিতরে স্ড়ঙগমধ্যে এক মহানাগ বাস করেন । তাহারই 
বিষের জ্বালায় বাহিরেও এত ভ্বালা। 

ব্রাক্মণগণ শশব্যস্তে হবিদাস ঠাকুরের নিকট আসিয়া সমস্ত 
বৃত্তান্ত জানাইলেন এবং তাহাকে তখনই গোফা ছাড়িয়া! অন্যত্র 
যাইতে অনুরোধ করিলেন। হরিদাস ঠাকুর হাসিয়া! বলিলেন, 
'কি আশ্চধ্য ! আমি এত দিন এ স্থানে আছি, কিন্তু এক দিনের 
তরেও ত কোনও জ্বীলা-যন্ত্রণ৷ অনুভব করি নাই ! তবে আপনার! 


৭৮ ঠাকুর হরিদাস 


নাকি অসহা জ্বালায় ক্লেশ পাইতেছেন, এজন্য আপনাদের 
অনুরোধে আমি এ স্থান পরিত্যাগ করিতে স্বীকৃত হইলাম, কিন্তু 
অস্য নহে, কল্য। এক্ষণে আমার একটি অনুরোধ যে, আপনারা 
সকলে মিলিয়া একবার শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল গান করুন। তাহাতে 
হয় ত এই জ্বাল! দূর হইতে পারে 1” 
তখন সকলে মিলিয়৷ হরিদাস ঠাকুরের কণ্টে কণ্ট মিলাইয়া 

হরিনাম-কুষ্ণজনাম কীর্তন করিতে লাগিলেন। আশ্চর্যের কথা 
এই যে, দেখিতে দেখিতে এক মহাকায় সর্প গোফার দ্বার দিয়া 
বাহিরে আসিয়া সর্ববসমক্ষে নির্ভয়ে ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। . 

*এইমত কৃষ্ণকথা মঙ্গল কীর্তীনে, 

থাকিতে অদ্ভুত অতি হৈল সেইক্ষণে। 

হরিদাস ছাড়িবেন শুনিয়া বচন, 

মহানাগ স্থান ছাড়িলেন সেইক্ষণ। 

মহামণি জলিতেছে মন্তক-উপরে, 

দেখি ভয়ে বিপ্রগণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ স্মরে |” 

(শ্রাীচৈঃ ভাঃ ) 
ইহা অসম্ভব ঘটনা! নহে । ফলত: আজকালকার দিনেও এই 

প্রকার ঘটনা ঘটিতে দেখা গিয়াছে । শ্রীঅদ্বৈতকুলপ্রদীপ সিদ্ধ 
মহাপুরুষ শ্রীম্ড বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রভূ যখন ঢাঁকানগরীর 
উপকণ্টস্থ গেগারিয়া-আশ্রমে বাস করিতেন, সেই সময়ে তাহার 
ক্ষুদ্র ভজন-কুটারে একটি বিষধর সর্প বাস করিত। গোস্বামী প্রভু 
তাহাকে প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে ছুধ-কল! দিতেন । সময় সময় 


পঞ্চম পারচ্ছেদ ৭৯ 


সেই সর্প গর্ত হইতে উঠিয়া কুটার-মধ্যে বিচরণ করিত, এবং 
কখনও গোসাঞ্জির ক্রোড়দেশে, কখনও বা তাহার জট বাহিয়' 
স্কন্ধে ও মস্তকের উপরে যাইয়া উঠিত। গোসাঞ্ঃ তখন 
চুপ্টি করিয়া রহিতেন। এই অদ্ভুত ঘটনা বহু লোকে প্রত্যক্ষ 
করিয়াছেন । 

আমরা পূর্বেবই বলিয়াছি যে, শ্রীমদ্বৈত আচায্যের নবদ্বীপেও 
এক টোল ছিল। অধুনা তিনি তথায় একটি ভক্তি-সভারও 
প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। প্রতিদিন গীতী-ভাগবত পাঠ ও হরি- 
ংকীর্তনে অদ্বৈতভবন মুখরিত হইতেছে । তখন নবদ্বীপে 
বৈষ্ুবের সংখ্য। নিতান্তই অল্প ছিল। বৃদ্ধ আচাষ্য কয়েকজনমাত্র 
ভক্ত লইয়া অদম্য উতসাহেব সহিত এই সভায় ভক্তির চর্চচ' 
করিতে লাগিলেন । শ্্রীহট্টনিবাসী শ্রীনিবাস আচার্য (শ্রীবাস 
নামে পরিচিত ) ও তাহার তিন ভ্রাতা শ্রীরাম, শ্ীপতি ও শ্রীনিধি 
আর মুরারি গুপ্ত, চন্দ্রশেখর আচার্য, চট্টগ্রামনিবাসী পুগুরীক 
বিদ্ভানিধি ও বান্ুদেব দত্ত এবং শ্রীমান্‌, শ্রীগরুড়, গঙ্জাদাস ও 
শুক্রান্বব ব্রহ্মচারী প্রভৃতি কয়েকটি ভক্ত নিয়মিতরূপে অদ্বৈত- 
সভা আদিতেন। তাহারা সকলে মিলিয়া পরাতে কি সন্ধ্যায 
হাতে তালি দিয়! সংকীর্তন করিতেন । এজন্য সমস্ত নবদ্বীপ 
ত্াহাদিগের উপর খডগহস্ত ছিল। হরিদাস ঠাকুর প্রাণে প্রাণে 
নবদ্বীপের বৈষ্ণবগণের প্রাণের সাড়া পাইয়াই যেন আর স্টিং 
থাকিতে পারিলেন না । ফুলিয়ার ব্রা্গণগপের নিকট বিদা 
লইয়া তিনি নবদ্বীপে চলিয়া আমিলেন। 


৮৪ ঠাকুর হরিদাস 


“বিষয়েতে মগ্ন জগৎ দেখি হরিদাস, 
হুঃখে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি ছাড়েন নিঃশ্বান। 
কত দিনে বৈষ্ব দেখিতে ইচ্ছা! করি, 
আইলেন হরিদাস নবদ্বীপপুতী |” 
(শ্রীচেঃ ভাঃ) 


ষ্ঠ পরিচ্ছেদ 


নবদ্বীপে 

হরিদাস ঠাকুর খন নবদ্বীপে আগমন করেন, সেই সময়ে 
নবদ্বীপের বৈষ্ণবগণ কি ভাবে কাল কাটাইতেছিলেন, পুর্ববাধ্যায়ে 
তাহার কিঞ্চিত আভাস দেওয়া হইয়াছে । এই সময়ে নবদ্বীপ 
জ্ঞানের চ্চায় ভারতে অদ্বিতীয় স্থান ছিল। শাস্ত্রাধ্যয়ন করিতে 
দেশবিদেশ হইতে পড়ুয়া আসিয়! নবদ্বীপে বাস করিত। তখন- 
কার নবদ্বীপ পণ্ডিতের নবদ্বীপ । জ্ভানের চর্চা বিলক্ষণ হইত। 
ভক্তির চচ্চা ও ভক্তির সাধনাকে পণ্ডিতেরা ভাবুকতার ধ্ম 
বলিয়। সর্ববদ! উপেক্ষা ও উপহাস করিতেন । তীহারা কেহ 
কেহ গীতা-ভাগবতও পড়াইতেন বটে, কিন্তু তাহাতে ভক্তির 
কথা না বলিয়। জ্ঞানের ব্যাখ্যাই করিতেন । সর্ববসাধারণ ধশ্মের 
নিয়ম পালন করিত কেবল অক্ষরে, কিন্তু ভাব রক্ষা করিতে 
পারিত না। জাত্যভিমান ও পাগ্ডিত্যাভিমান সমাজে ভত্যন্ত 
প্রবল ছিল। 


ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ ৮১ 


ত্কালে নবদ্বীপে ভক্তির ধন্ম প্রায় ছিল না বলিলেও 
অতত্যুক্তি হয় না। অতি বড় সুকৃতী ধিনি, তিনি হয় ত স্নানের 
সময় ছুই একবার গোবিন্দ কি প্ুগুরীকাক্ষ নাম উচ্চারণ 
করিতেন, এই পধ্যস্তই । শ্রীঅদ্বৈতের সঙ্গে মিলিয়া যে কয়েকটি 
বৈষ্ণব নিষ্ঠার সহিত ভক্তিধশ্মনাচরণ করিতেন, তাহাদিগকে 
সর্ববদ! লাঞ্ছিত হইতে হইত। “সোহহং ভাবটা তখন প্রায় সকল 
লোকের মধ্যেই, প্রাণে নহে, কিন্তু বচনে ছড়াইয়! পড়িয়াছিল। 
তাই তাহারা বলিতেন, পত্রহ্ম ত ঘটে পটে লর্ববান্রই বর্তমান । 
আমি ব্রহ্ম ॥ স্ৃতরাং ডাকিব কাহাকে ? এই মূর্খ গুলা বৃথা 
হরি হরি বলিয়া চী্কার কবে কি জন্য? ইহারা সমাজের 
উপব্রববিশেষ। ইহাদিগের ঘর-দরজা ভাঙ্গিয়া গঙ্গায় ভাসাইয়া 
দিলে তবে এদের উপযুক্ত শাস্তি হয়।» 


“বলিলেও কেহ নাহি লয় কৃষ্ণ নাম, 

নিরবধি বিগ্ভাকুল করেন ব্যাখ্যান। 

অতি বড় স্থকৃতী সে স্নানের সময়, 

গোবিন্দ পুগ্ডরীকাক্ষ নাম উচ্চারয়। 

গীত ভাগবত যে যে জনেতে পড়ায়, 

ভক্তির ব্যাথ্যান নাহি তাহার জিহ্বায়। 

হাতে তালি দিয়া যে সকল ভক্তগণ, 

আপন অংপনি মেলি করেন কীর্ভন। 

ঙাহাতেও উপহাপ করয়ে সবারে, 

ইহারা কি কার্যে ডাক ছাড়ে উচ্চৈঃম্বরে ? 
৬ 


২ ঠাকুর হরিদাস 


আমি ব্রহ্ম, আমাতেই বৈসে নিরঞ্জন, 
দাস প্রভূ ভেদ বা করয়ে কি কারণ? 
এগুলার ঘর দ্বার ফেলাই ভাঙ্গিয়!, 
এই যুক্তি করে সব নদীয়া! মিলিয়া । 
শুনিয়া পায়েন হুঃখ সর্বভক্তগণ, 
সম্ভাষ করেন হেন নাহি কোন জন।” 


( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


দেশমধ্যে যখন তক্তির এরূপ দারুণ ছুভিক্ষ, সমস্ত সমাজ 

বখন তুচ্ছ বিষয়-রসে উন্মত্ত, যখন বিষুতক্তগণ চতুদ্দিক্‌ শূন্য 
দেখিয়া! “হা "কৃষ্ণ হা কৃষ্ণ বলিয়া হাহাকার করিতেছিলেন, 
এমন সময়ে ভক্তির বিগ্রহস্বরূপ হরিদাস ঠাকুর আসিয়া! নবদ্বীপে 
উপস্থিত হইলেন । এ ছুপ্দিনে তাহার ন্যায় একজন ভক্তিমান্‌, 
শক্তিমান্‌, সমধ্মী ও ব্যথার ব্যথী পাইয়া ভক্তগণ প্রাণে আশৃস্ত 
হইলেন, শ্রীঅদ্বৈত উচ্ছসিত আনন্দের আবেগে হুঙ্কার করিয়া 
নৃত্য করিতে লাগিলেন । 

“শন দেখি ভক্তগণ সকল সংসার, 

হা! কৃষ্ণ বলিয়া তঃখ ভাবেন অপার। 

হেন কালে তথায় আইল হরিদাস, 

শুদ্ধ বিষ্ুভক্তি যার বিগ্রহ প্রকাশ। 

পাইয়া! তাহার সঙ্গ আচার্ধা গোসাঞ্ডি, 

হুঙ্কার করেন আননের অস্ত নাই ।” 


( গ্ীচৈঃ ভাঃ) 


ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ ৮৩ 


হরিদাস ঠাকুরের আগমনের পর হইতে নব উদ্যমে ভক্তি- 

সভার কাধ্য চলিতে লাগিল। কিন্তু তাহাতে বিরোধিগণের 
উপন্রব কিছুমাত্র কমিল না, বরং বাড়িয়া চলিল। তক্তবৃন্দ 
অতিমাত্র ছুঃখিতান্তঃকরণে জগতের কল্যাণ-কামনায় দিবানিশি 
তুভারহারী ভগবানকে ডাকিতে লাগিলেন এবং আশাবন্ধ সমুত- 
কণার সহিত তাহার অবতরণের প্রতীক্ষা করিয়া রহিলেন। 

“স্বকাধ্য করেন সব ভাগবতগণ, 

রুষ্ণ-পূজ। গঙগা-নান ক্র কথন। 

সবে মেলি জগতেরে করে আশীর্বাদ, 

শীপ্র কৃষ্ণচন্দ্র কর সবারে প্রসাদ 1৮ 

এই সময়ে হরিদাস ঠাকুরের বয়স আনুমানিক চৌত্রিশ 

বতসর এবং শ্রীঅদ্বৈতাচাধ্যের বয়ঃক্রম একান্ন বুসর হইবে। 
আচাধ্যের এক জ্ঞান, এক ধ্যান--কত দিনে কৃষ্ণচন্দ্র অবতীর্ণ 
হইয়া জীবের ছুঃখ দূর করিবেন। সেই 'জ্ঞানভক্তি-বৈরাগ্যের 
মুখ্য গুরু” শ্রীঅছৈত ভক্তগণ-সঙ্গে নিরবধি কৃষ্ণকীর্তন ও কৃষ্ণ- 
ভক্তির ব্যাখ্যান করিতেছেন, আর, 'তুলসীমপ্তরী সহিত 
গঙ্গাজলে' শ্রীগোবিন্দের অর্চনা করিতেছেন এবং শ্ত্রীকৃষ্ণের 
আবেশে ঘন ঘন কুষ্কার করিতেছেন 

“তুলসীর মঞ্জরী সহিত গঙ্গাজলে, 

নিরবধি সেবে কৃষ্ণ মহ! কুতুহলে। 

হুঙ্কার করয়ে কৃঞ্চ আবেশের তেজে। 


সে ধ্বনি বরহ্গাণ্ড ভেদি বৈকুষ্ঠেতে বাজে ।” 
( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


৮৪ ঠাকুর হরিদাস 


ইহার প্রায় এক বশুসর কাল পরে চৌদ্দশত সাত শকে 
ফাল্গুনী পুণিমা তিথিতে সিংহরাশি সিংহলগ্নে সায়ংকালে চন্দ্র 
গ্রহণের সময় শ্রীশচীনন্দন শ্রীগৌরাঙ্গ ভূমিষ্ঠ হয়েন। গ্রহণোপ- 
লক্ষে সমস্ত নদীয়ার লোক গঙ্গান্নানে যাইতে লাগিলেন । দেশ- 
বিদেশ হইতেও কত লোক এই শুভক্ষণে শুভযোগে গঙ্গান্ান 
করিবার নিমিত্ত নবদ্বীপে আসিয়াছেন। সহজ সহন্র লোক 
স্নান করিতেছেন, দান করিতেছেন ও গ্রহণ দর্শন করিতেছেন-_ 
সকলেই মনের উল্লাসে হরিধ্বনি করিতেছেন । শঙ্খ, ঘণ্টা, 
কাসরের ধ্বনির সহিত লক্ষ কণ্টের হরিধ্বনি মিলিয়া তণুকালে 
নবদধীপে যেন গোলোকের আনন্দ-বৈভব ব্যক্ত করিতেছিল। 
এই পরম শুভ মুহূর্তে কোটি চন্দ্রের কান্তি শ্লান করিয়া কাঞ্চন- 
গৌর গৌরচন্দ্র প্রকাশিত হইয়া শচীমায়ের কোলে হাসিতে 
লাগিলেন। তাহার আবির্ভাবে দশদিক্‌ প্রসন্ন হইল, স্থাবরজঙ্গম 
আনন্দ-প্রী ধারণ করিল । 


“প্রসন্ন হৈল দশদিক প্রসন্ন নদীজল, 
স্থাবর জঙ্গম হল আনন্দে বিহ্বল 1” 
“সেই কালে নিজালয়ে উঠিয়া! অদ্বৈত রায়ে 
নৃত্য করে আনন্দিত মনে, 
ভরিদাস লৈয়৷ সে হুঙ্কার কীর্তন রঙ্গে 
কেনে নাচে কেহ নাহি জানে। 
জগৎ আনন্দময় দেখি মনে সবিন্ময় 
ঠারে ঠোরে কহে হরিদাস, 


ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ ৰ ৮৫ 


তোমার এ্রছন রঙ্গ মোর মন পরসন্ন 
দেখি কিছু কার্যে আছে ভাস।” 
( শ্রীচৈতন্তচরিতামৃত ) 


শ্রীগৌরাঙ্গের আবির্ভাবের পর পনর ষোল বৎসর পর্য্যন্ত 
হরিদাস ঠাকুরের জীবনের বিশেষ কোনও ঘটনার উল্লেখ 
্ন্থপত্রে দৃষ্ট হয় না। এতাবগুকাল তিনি শ্রীমদৈত, শ্রীবাস 
আচাধ্য প্রভৃতির সঙ্গে কৃষ্ণকথায়, কৃষ্ণকীর্তনে ও নামজপব্রত- 
উদযাপনে অতিবাহিত করিতেছিলেন, ইহা সহজেই অনুমিত 
হয়। তিনি মাঝে মাঝে শ্রীঅদ্বৈতৈর সঙ্গে ন্বদ্ধীপ হইতে 
শাস্তিপুরে গিয়াও থাকিতেন। শ্রীগৌরাঙ্গ যখন কিশোর- 
যৌবনে অধ্যাপনা শেষ করিয়া সংকীর্তন-যজ্ঞের মাঝে স্বীয় 
উজ্জ্বল মহিমায় বিরাজিত; যখন শ্রীঅদ্বৈত স্পষ্টই বুঝিতে 
পারিলেন যে, তিনি এত ব্রত-উপবাস করিয়! গঙ্গাজল-তুলসী 
দ্বার যাহার অচ্চনা করিয়াছিলেন, ধাহার নামে হুঙ্কার করিয়া- 
ছিলেন, ইনিই তাহার সেই প্রাণের ঠাকুর ; যখন শ্রীবাসের 
আঙ্গিনায় হরিসংকীর্তনের মাঝে সেই কনক-পুতলিয়া শচীছুলালের 
ভুবনমোহন নর্তন ও ভাবাবেশ দেখিয়া তক্তবৃন্দ দেহ-গেহ 
ভুলিয়া অহনিশি গৌর-প্রেমে উন্মত্ত; যখন ভায়ার প্রেমে 
মাতোয়ারা অবধৃত নিত্যানন্দ নবন্বীপে আসিয়া গৌরপ্রেমের উত্তাল 
তরঙ্গ তুলিয়াছেন; যখন গৌরপ্রেমে “শান্তিপুর ডুবুড়ুবু, নদে 
ভেসে যায়”; সেই সময় হইতে আবার নান ভাবের মধ্যে হরিদাস 
ঠাকুরের ভক্তিবিলসিত নিদ্ধ মুক্তি আমাদের নয়নগোচর হয়। 


৮৬ ঠাকুর হরিদাস 


একদিন শ্রীবাসের আঙ্গিনায় সপ্তপ্রহরব্যাপী মহাসংকীর্ততনে 
শ্রীগৌরাঙ্গ সকল ভক্ত লইয়া মহাভাবে নৃত্য করিয়াছিলেন এবং 
সেই ভাবের আবেশেই এক এক করিয়া সকলকে নিকটে 
ডাকিয়া আশীর্ববাদ করিয়াছিলেন । মহাপ্রভু হরিদাস ঠাকুরকে 
ডাকিয়া বলিলেন_-“হরিদাস! তুমি আমার দেহ হইতেও অধিক 
প্রিয়। তোমাকে নিষ্ঠরেরা যে বাজারে বাজারে প্রহার 
করিয়াছে, তাহা স্মরণ করিলে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়। সেই 
আঘাত এখনও আমার অঙ্গে বাজিতেছে। ধন্য তুমি ! যাহারা 
এত লাঞ্ন। দিয়া! তোমাকে মারিল, তুমি তাহাদের কল্যাণকামন। 
করিয়াছিলে !» 


“পাপিষ্ঠ বনে তোম| দিল বড় ছুঃখ, 
তাঙ্বা সঙরিতে মোর বিদরয়ে বুক । 

প্রাণাস্ত করিয়া তোম৷ মারয়ে সকলে, 
তুমি মনে চিন্ত তাহে সবার কুশলে।” 


(শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


হরিদাস ঠাকুর মহাপ্রভুর বহু স্তব-স্তরতি করিয়া একান্ত 
দৈম্থসহকারে বলিলেন- _শ্রীশচীনন্দন! আমি তোমার 
চিরদাস। আমাকে এই কৃপা কর, আমি যেন তোমার ভক্তের 
দুয়ারে কুকুর হইয়া থাকিতে পারি। ধাঁহার৷ তোমার সেবক, 
আমি যেন কাহাদিগের উচ্ছিষ্ট পাইয়! কৃতার্থ হই |» 


সগুষ পরিচ্ছেদ ৪ 
শ্রীগৌরাঙ্গ বলিলেন-_ 


“তোমাকে যে করে শ্রদ্ধা আমাকে সেকরে, 
নিরবধি আছ আমি তোমার শরীরে । 

তুমি হেন সেবকে আমার ঠাকুরাল, 

তুমি আম! হৃদয়ে বান্ধিল। সব্বকাল ।” 


( শ্রাচৈঃ ভাঃ) 


সপ্তম পরিচ্ছেদ 


জগাই-মাধাই । 


এ স্থলে শ্রীমনিত্যানন্দ প্রভু সম্বন্ধে সংক্ষেপে কয়েকটি কথা 
বলা আবশ্যক মনে হইতেছে । রাটদেশে একচক্র নামক এক 
গ্রামে দ্বাপরধযুগে পঞ্চপাগ্ডব একবৎপরকাল অজ্ঞাত, ঝনবাসে 
ডিলেন। উহার বর্তমান নাম একচাকা। শ্রীগৌরাঙ্গের 
আবির্ভাবের দ্বাদশ বওসর পূর্বেব এই একচাকা গ্রামে মাথী শুক্লা 
ত্রয়োদশী তিথিতে রাটীয় শুদ্ধ শ্রোত্রিয় ব্রাঙ্মণকুলে নিত্যানন্দ 
জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম হাড়াই ওঝা, মাতার নাম 
পল্মাবতী। নিত্যানন্দের বাল্যকালেই পিতা-মাতা তাহাকে এক 
পরিব্রাজক সাধুর হস্তে সমর্পণ করেন। নিত্যানিন্দচন্দ্ 
আধ্্যাবর্ত ও দক্ষিণাপথের প্রায় সমস্ত তীর্থ পরিভ্রমণ করিয়া 
তাহার প্রথম যৌবনে নবহ্বীপে আসিয়া শ্রীগৌরাঙ্সের সহিত 


৮৮ ঠাকুর হরিদাস 


মিলিত হয়েন। গৌড়ীয় বৈষ্ঞবগণ বিশ্বাস করেন যে, যান 
যশোদানন্দন শ্রীকৃষ্ণ, তিনিই এই শচীনন্দন শ্রীগৌরাঙগ, আর 
যিনি রোহিণীনন্দন শ্রীবলদেব, তিনিই এই যুগে পল্মাবতী'কুমার 
শ্রীমন্িত্যানন্দ। শ্রীঅদ্বৈত মহাবিষুণ্ুর অবতার | 


“তের শত পচানববই শকে মাঘমাসে, 
স্ক্লা ত্রয়োদশীতে রামের পরকাশে। 
ব্রজে বলরাম ধেঁই সেঁই নিত্যানন্দ, 
অবতীর্ণ হৈলা বিতরিতে প্রেমানন্দ |” 


( শ্রীঅদ্বৈত প্রকাশ ) 


নিত্যানন্দ প্রভুর নবদীপে আগমনের পর হইতে শ্রীবাসেব 
আঙ্গিনায় দ্বিগুণ উৎসাহের সহিত প্রতিদিন জমাট হরিসংকীর্তন 
হইতে লাগিল । সকালে, বিকালে, সন্ধ্যায়, এমন কি নিশীথ- 
কালে পর্যন্ত গৌর-নিতাই ভক্তসঙ্গে কীর্তনানন্দে বিভোর 
থাকিতেন। এই সময়ে একদিন শ্রীগৌরাঙ্গ নিত্যানন্দপ্রভু ও 
হরিদাসঠাকুরকে ডাকিয়া বলিলেন-__ 

“গুন শ্রীপাদ ! শুন হরিদাস! তোমাদিগের উপর আমি 
একটি বিশেষ কার্যের ভার অর্পণ করিতেছি । অয হইতে 
তোমরা দুই জনে এই নবদ্বীপের ঘরে ঘরে যাইয়া সকলকে 
ছরিনাম লওয়াইবে। দেখ, শ্রীকঞ্ণবিমুখ হইয়া জীব কত দুঃখ 
পাইতেছে। তোমরা যাহাকে দেখিবে, অবিচারে তাহাকে ই 
কৃষ্ণনাম শুনাইবে ও শ্ীকৃঞ্চতজন উপদেশ করিবে । ইহা 


সপ্তম পরিচ্ছেদ ৮৯ 


ভিন্ন আর কোনও কথা বলিবে না, বলাইবেও না । দিবাশেষে 
আলিয়া তোমাদের প্রচারের বৃত্তান্ত আমাকে জানাইবে ।৮ 
শ্রীগৌরাঙ্ের আজ্ঞা পাইয়া নিত্যানন্দ ও হরিদাস হরিনাম 

প্রচার করিতে নগরে বাহির হইলেন। গৌরপ্রেমে মাতোয়ারা 
নিতানন্দ একেই ত অফষ্টপ্রহর ভাবে ডগমগ, তাহাতে আবার 
গৌরাঙ্গের আদেশ । এ দেখ, প্রেমে মত্ত নিতাইটাদ মদমন্ত 
কুগ্তরের ন্যায় কেমন হেলিয়৷ ছুলিয়া নদীয়ার রাজপথ দিয়! 
যাইতেছেন। নিত্যানন্দের অবধৃত-বেশ, স্থুবলিত গঠন, উন্নত 
দেহ, চিক্কণ শ্যামবর্ণ। নিতাইচাদ নদীয়ার বাজার আলো 
করিয়া যাইতেছেন। জীবের দুখে নিরন্তর অস্তর দহিতেছে, 
তাই বুঝি কমলদলের ন্যায় বিস্তৃত রাতুল যুগলনেত্র করুণায় 
ছল-ছল করিতেছে । নিতাই আগে আগে যাইতেছেন, আর 
সঙ্গে সঙ্গে হরিনাম করিতে করিতে, নাম-রসে ভরপুর হইয়া, 
হরিদাস ঠাকুর যাইতেছেন। নিত্যানন্দ নবীন যুবক, হুরিদাস 
প্রবীণ বুদ্ধ । নিত্যানন্দ বাল্যভাবে সদাই চঞ্চল, হরিদাস স্ির- 
গম্ভীর। উভয়েরই সাধুর বেশ। তীহারা নদীয়ার ঘরে ঘরে 
যাইয়া বলিতে লাগিলেন-__ 

“বল কৃষ্ গাও কৃষঃ ভজহ কৃষেেরে ।” 
আরও বলিলেন-_ 

“কৃষ্ণ প্রাণ কৃষ্ণ ধন কৃষ্ণ সে জীবন, 

হেন কৃষ্ণ বল ভাই হই একমন।” 

( শ্রীচৈঃ তাঃ) 


৯০ ঠাকুর হরিদাস 


উভয়ের সাধুর বেশ দেখিয়া, বাহার একটু ভাল লোক, 
তাহারা তাহাদিগকে ভিক্ষার জন্য সনির্বন্ধে নিমন্ত্রণ করিতে 
লাগিলেন। কিন্তু নিতাই-হরিদাস বলিলেন, “ভাই, আমরা 
অন্য কিছুর প্রার্থী নহি, এইমাত্র ভিক্ষা চাই যে, তোমরা. বদন 
ভরিয়। কৃষ্ণচনাম লও, আর কৃষ্ণের ভজনা কর 1” তাহা শুনিয়া 
কেহ বলিলেন, “আচ্ছা, ভাল কথাই ত, তা করিব।” অপর 
কেহ কেহ বলিলেন,+“এই ছুইজন বলে কি? বুঝি বা ইহার! 
মন্ত্রদোষে পাগল হইয়াছে। নিমাই পণ্ডিতের মাথা খারাপ 
হইয়াছে, সে-ই সকলকে নষ্ট করিতেছে । কত ভব্যসব্য 
লোক নিমাইয়ের সঙ্গে মিশিয়া একবারে উচ্ছন্ন গিয়াছে !” 
আবার কেহ কেহ বলিলেন, “এ ছুই বেটা নিশ্চয় চোর। 
দিনের বেলা সাধু সাজিয়া ঘরে ঘরে ভিক্ষার ছলে বেড়ায়, আর 
রাত্রে আসিয়া সিঁদ কাটে। ইহাদিগকে দেয়ানে ধরাইয়া দিলে 
আকেল হয়।” নিত্যানন্দ ও হরিদাস সকলের উক্তি শুনিয়। 
হাসেন, আর বলেন-_প্রভু ভাল হরিনাম লওয়াইতে পাঠাইয়া- 
ছেন! এইরূপে পরম কৌতুকে ছুই জনে নদীয়ার ঘরে ঘরে 
হরিনাম প্রচার করিয়া বেড়ান এবং সন্ধ্যার সময় আসিয়। 
শ্রীগৌরাঙ্গের নিকট দিবসের প্রচার-বৃত্তান্ত নিবেদন করেন। 

ক্রীনিত্যানন্দ ও হরিদাস ঠাকুর একদিন প্রচারে বাহির 
হইয়া দেখিলেন, পথের মধ্যে ছুই প্রকাণ্ড মাতাল আস্ফালন 
পুর্ববক বিচরণ করিতেছে । তাহার! ক্ষিপ্ত মহিষের হ্যায় ছুটিয়া 
পথের লোকদিগকে তাড়া করিতেছে, গালি পাড়িতেছে, আবার 


সপ্তম পরিচ্ছেদ ৯১ 


কখনও বা নিজেরাই ছু'জনে কিলাকিলি চুলাচুলি করিয়া মাটীতে 
পড়িতেছে, আবার উঠিতেছে। তাহাদিগকে দুর হইতে দেখিয়াই 
লোকেরা প্রাণের দায়ে ছুটিয়া পলাইতেছে। 

“তই জন পথে পড়ি গড়াগড়ি যায়, 

যাহারেই পায় সেই তাহারে কিলায়। 

ক্ষণে ছুই জনে প্রীত ক্ষণে ধরে চুলে, 

চকার বকার শব্ধ উচ্চ করি বলে।” 

( শ্রাচৈঃ ভাঃ) 
নিত্যানন্দ করুণার্্-হ্ৃদয়ে পথের লোকদিগকে এই ছুই 

জনের নাম, ধাম ও জাতির পরিচয় জিজ্ঞাসা! করিলেন । তাহার 
বলিল, “কি বলিব গোসাঞ্জি ! এই নবদ্বীপেই ইহার্দিগের 
বাস। দুই সহোদর । জ্যেষ্ঠের নাম মাধব, আর কনিষ্ঠের নাম 
জগন্নাথ । অতি উচ্চ সন্ত্রান্ত ব্রাহ্মণ-পরিবারে জম্ম । বাল্য- 
কালেই কুসঙ্গে পড়িয়া স্থরাপানাসক্ত হয়। আর এখন ত 
এই অবস্থা । ইহারা না করিয়াছে, এমন পাপ নাই ।+ চুরি, 
ডাকাতি, মদ্যপান, পরের ঘরবাড়ী পোড়াইয়া দেওয়া, নরহত্যা, 
ব্যভিচার ও গোমাংসভক্ষণ, এ সমস্ত ইহাদিগের নিত্যনৈমিত্তিক 
কম্ম |% 


“সে তুই জনার কথা কহিতে অপার, 
তার! নাহি করে হেন পাপ নাহি আর। 
ব্রাহ্মণ হইয়া মন্ত-গোমাংস ভক্ষণ, 


ডাক! চুরি পরগৃহ দাহে সর্ববক্ষণ।” 
( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


৯২ ঠাকুর হরিদাস 


শ্ীগৌরাঙ্গ বিলক্ষণ জানিতেন যে, দেশের যেরূপ অবস্থা, 
তাহাতে হরিনাম প্রচার কর! যার তার কন্ম নয়। এ ক্কার্যের 
জন্য, জীবের দুঃখে কাতব মহাপ্রাণ শক্তিমান্‌ ব্যক্তির প্রয়োজন । 
এ নিমিত্ত তিনি মহাশক্তিধর করুণার সাগর নিতাইটাদকে 
জীবের কাণে নাম শুনাইতে পাঠাইলেন এবং তাহার সঙ্গে 
দিলেন বারংবার অগ্নি-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আমাদের হরিদাস 
ঠাকুবকে । জগাই-মাধাইয়েব দুর্দশার কথা শুনিয়া ও স্বচক্ষে 
কিঞ্চিগ প্রত্যক্ষ করিয়! নিত্যানন্দের দয়ার প্রাণ একান্ত বিচলিত 
হইল। তিনি করুণা-কাতর অন্তরে প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, 
এই ছুই জনকে উদ্ধার করিতেই হইবে । আহা! ইহারা 
মদের নেশায় এখন যেমন আত্মহারা, যে দিন শ্রীকৃষ্ণের নামে 
তেমনি ধারা হইবে, আর যে দিন আমার প্রভু শ্রীগৌরাঙ্গের 
নামে কীাদিয়া সারা হইবে, সেই দিন জানিব যে, আমার সমস্ত 
পর্য্যটন সার্থক হইল। যাহারা ইহাদের ছায়া স্পর্শ করিলে 
সঙ্ঠঃ যাইয়া গঙ্গান্নান করে, তাহার! যদ এই ছুই জনকে দেখিয়৷ 
গঙ্গান্নানতুল্য জ্ঞান না করে, তবে আমি নিত্যানন্দ নাম বৃথাই 
ধারণ করি 1” 

নিত্যানন্দ মনে মনে এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়া প্রকাশ্যে 
হুরিদাসঠাকুরকে কহিলেন--“দেখ হরিদাস! ব্রাহ্মণকুলে 
জদ্মিয়া ইহাদের কি ছুর্গতি! যদি তোমার কৃপা হয়, তবেই 
এই দুইটি জীব উদ্ধার পায়। যবনেরা তোমাকে প্রাণাস্ত 
করিয়া প্রহার করিল, তথাপি তুমি তাহাদিগের কুশলকামনাই 


সগুম পরিচ্ছেদ ৯৩ 


করিয়াছিলে। তুমি বদি ইহাদের একটু শুভানুসন্ধান কর, 
তবেই ইহার। তরিয়া যায়।» 


“প্রাণান্তে মারল তোম৷ যবনের গণে, 
তাহারও করিলে তুমি ভাল মনে মনে। 
যদি তুমি শুভান্রসন্ধান কর মনে, 

তবে সে উদ্ধাব পায় এই ছুই জনে ।* 


( শ্ীচৈঃ ভাঃ) 


হরিদাসঠাকুর নিত্যানন্দ প্রভুকে ভালরূপেই জানিতেন। 
এ সকল কথা শুনিয়া তিনি মনে মনে বুঝিলেন যে, এই ছুই 
জনের উদ্ধার হইতে আর বিলম্ব নাই। তাই বলিলেন-- 
“শ্রীপাদ! তুমি আমাকে মিছ! ছলনা করিতেছ কেন ? স্বয়ং 
তুমি যাহাদের উদ্ধার চিন্তা কর, তাহারা ত উদ্ধার হইয়া 
শিয়াছে। আর, আমার জানিতে বাকী নাই যে, তোমার 
যে ইচ্ছা, মহাপ্রভূরও সেই ইচ্ছা |” 

তখন নিত্যানন্দ হাস্থপূর্ববক হরিদাসঠাকুরকে আলিঙ্গন 
করিয়া বলিলেন-_“আচ্ছা, যাক সে কথা । তবে এস, ছুই জনে 
উহাদিগের কাছে যাইয়া কৃষ্ণনাম শুনাই। প্রভুব আজ্ঞা এই 
যে, অবিচারে সকলকে কৃষ্ণনাম বিলাইতে হইবে, বিশেষতঃ 
পাপিতাগীকে । আমার্দিগের উপর শুধু বলিবার ভার, আমরা 
বলিয়াই মুক্ত । যদি উহারা আমাদের কথায় কৃষ্ণ না বলে, 
কৃষ্ণ না ভে, তবে সে কথ! প্রভু বুঝিবেন ।” 


৯৪ ঠাকুর হরিদাস 
“সবারে ভজিতে কৃষ্ণ প্রভূর আদেশ, 
তার মধ্যে অতিশয় পাপীরে বিশেষ । 
বলিবার ভার মাত্র আম! দোহাকার, 
বলিলে না লয় যবে সেই ভার তার ।” 
( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


অতঃপর ছুই জনে কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলিতে বলিতে জগাই- 
মাধাইয়ের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন । কিন্তু রাস্তার 
লোকের! তাহাদিগকে সে দিকে যাইতে নিষেধ করিয়। বলিল-_ 
“তোমরা বিদেশী সাধু, ইহাদিগকে চিন না। ইহারা ঠাকুর, 
দেবতা, সাধু, সঙ্জন, কিছুই মানে না। তোমরা সাধু বলিয়া 
যে উহার তোমাদিগকে ছাড়িয়া দিবে, তাহা মনেও করিও না; 
জগাই-মাধাই তেমন পাত্রই নয়। তোমরা! উহাদের নিকট 
যাইও না, বিপদে পড়িবে ।” তাহার! হিত-কথাই বলিল, 
সন্দেহ নাই। কিন্তু মহাপ্রভুর আজ্ঞা যে, অবিচারে সকলকে 
কৃষ্ণনাম শুনাইতে হইবে । স্ৃতরাং ছুই সাধু যাইতে যাইতে 
জগাই-মাধাইয়ের নিকটবত্তী হইয়া বলিলেন-__ 


“বল কৃষ্ণ ভজ কৃষ্ণ লও কৃষ্ণ নাম, 
কৃষ্ণ মাতা কৃষ্ণ পিতা কৃষ্ণ ধন প্রাণ ।* 
(শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


জগাই-মাধাই নেশার ঝোকে অন্যমনস্ক থাকাতে এতক্ষণ 
নিত্যানন্দ-হরিদাসকে দেখিতে পায় নাই। কিন্তু তাহাদ্দিগের 


সগুম পরিচ্ছেদ ৯৫. 


মুখের এ সকল শব শুনিবামাত্র 'মাথা তুলিয়া সম্মুখের দিকে 
চাহিতেই দেখে যে, দুই জন সন্যাসী বড় গলায় কুষ্ণনাম 
লইতেছে। আর কি রক্ষা আছে? রাঙ্গা কাপড় দেখিলে 
যেমন মহিধ ক্ষেপে, সেইরূপ ছুই বণ্তামার্ক ক্ষেপিয়া ধর্‌ 
ধর বলিয়! নিত্যানন্দ ও হরিদাসকে এমনি তাড়া করিয়। 
আসিল যে, তাহারা ভয়ে দৌড়াইয়া পলাইতে বাধা হইলেন । 
উভয়ে উর্ধশ্বাসে দৌড়াইতেছেন, জগাই-মাধাইও তর্তভন- 
গঙ্জন করিয়া পশ্চা পশ্চা ছুটিতেছে। এই ধরি ধরি 
করিয়া! ধরিতে পারিতেছে না। সেই ছুই জনের কি ভয়ঙ্কর 
মুর্তি! রক্ত-জবার মতন চক্ষু, আর অস্থুরের স্টায় প্রকাণ্ড দেহ, 
সর্ববা্গ ঘর্ম্মাক্ত ও ধুলিধূসরিত। ভাগ্যে ছুই জনই স্থুলকায়, 
দ্রুত দৌড়াইতে অক্ষম, বিশেষতঃ সৃরার প্রভাবে টলটলায়মান, 
তাই রক্ষা। নিত্যানন্দ ও হরিদাস ছুটিতেছেন আর এক 
একবার পিছন ফিরিয়া চাহিয়া দেখিতেছেন । হরিদাস নিতাইকে 
শুনাইয়া শুনাইয়া বলিতেছেন, “আর ত আমি চলিতে 
পারিতেছি না । সেবারে যবনের হস্ত হইতে কোনও প্রকারে 
প্রাণটা লইয়া! ফিরিতে পারিয়াছিলাম । আজ এই চঞ্চলের 
বুদ্ধিতে আসিয়! বুঝি বা তাহা হারাইলাম 1” 

নিতাই বলিলেন--“বেশ, বিলক্ষণ ! আমি হইলাম চঞ্চল! 
তোমার প্রভুটির দোষ তুমি কিছুই দেখ না। হাঁ, ব্রাহ্মণ 
হইয়া যেন রাজার ন্যায় আদেশ জারি করেন। তার আজ্ঞা 
না শুনিলেও দোষ, আর উহা! পালন করিতে গেলে ত এই 


৬ ঠাকুর হত্রিদাস 


লাভ! তার পর লোকে চোর, ঢউ, ছাড়! বলে না। তুমি ত 
বেশ আমাকে দুধিতেছ। ছুই জনে গিয়া উহাদের কাছে 

প্রভুর আজ্ঞা বলিলাম, আর দোষী হইলাম একল। আমি, ? 

“আপন প্রভুর দোষ না জানহ তুমি, 
ছুই জনে বলিলাম, দোষভাগী আমি 1” ৰ 

(শ্রীচৈঃ ভাঃ) 
উভয়ে পরম কৌতুকে এইরূপ প্রেমকোন্দল করিতে 
করিতে চলিলেন। শ্রীগৌরাঙ্গের বাটার সন্নিকটবর্তী হইয়া 
পশ্চাৎু ফিরিয়া চাহিতেই দেখেন ষে, দস্থ্যদ্ধয় বহুদুরে রহিয়াছে 
এবং তীাহাদিগের লাগ না পাইয়। এখন নিজেরাই হুড়া- 
কুড়ি করিতেছে । নিত্যানন্দ-হরিদ্াসের ধড়ে প্রাণ আসিল। 
তাহার কৃষ্ণ কৃষ্ণ স্মরণ করিয়া পরস্পর প্রেমে কোলাকুলি 
করিলেন এবং হাসিতে হাসিতে শ্রীগৌরাঙ্গের নিকট যাইয়া 
উপস্থিত হইলেন। মহাপ্রভু ভক্তমণ্ডলী-পরিবুত হইয়া কৃষ্ণকথা 
কহিতেছিলেন। এমন সময় নিত্যানন্দ ও হরিদাস আসিয়। 
অগ্যকার সমস্ত বৃত্তান্ত বলিতে লাগিলেন। গঙ্গাদাস ও শ্রীবাস 
আচাধ্য জগাই-মাধাইয়ের চরিত্র বিশেষ অবগত ছিলেন । তাহারা 
উহাদের সমস্ত কুচেষ্টার কথা মহাপ্রভুর নিকট বর্ণনা করিলেন। 
তখন নিত্যানন্দ বলিলেন--ণপ্রভে। ! আমার এক নিবেদন 
আছে। আমার সোজা কথা। তুমি যদি এই ছুই জনকে 
উদ্ধার না কর, তবে ইহারা থাকিতে আমি আর কোথাও যাইব 
না। যাহারা ম্বভাবতঃই ধাশ্মিক, তাহাদিগকে হরিনামে 


সপ্তম পরিচ্ছেদ ৯৭ 


নাচাইতে, কাদাইতে, মাতাইতে কে না পারে ? তাহাতে একটা 
গৌরব কি? যদি তুমি এই ছুই মাতালকে হুরিনামে উদ্ধার 
করিয়া হরিপ্রেমে কীদাইতে পার, ঠুতবেই বুঝিব তোমার 
মহিমা ।৮ 
শ্রীগৌরাঙ্গ হাসিয়া বলিলেন__পজ্রীপাদ ! বুঝিলাম, কৃষ্ণ 

অচিরেই উহাদিগকে উদ্ধার করিবেন। যখন উহারা তোমার 
দর্শন পাইয়াছে, বিশেষতঃ তুমি উহাদিগের মঙ্গল চিস্ত। করিতেছ, 
তখন সেই ছুই জনের উদ্ধারের আর বিলম্ব নাই ।” 

“হাসি বলে বিশ্বস্তর পাইবে উদ্ধার 

যেইক্ষণে দরশন পাইল তোমার । 

বিশেষ চিন্তহ তুমি এতেক মঙ্গল, 

অচিরাতে কৃষ্ণ তার করিব কুশল ।” 

( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 
হরিদাসঠাকুর একটু দূরে যাইয়া অদ্বৈত প্রভুর কাছে রহস্য 
করিয়া বলিতে লাগিলেন-_-“দেখ প্রভু, মহাপ্রভুর কি রকম 
চমণ্ডকার ব্যবস্থা! আমাকে এই চঞ্চলের সঙ্গে নিত্য পাঠাইয়া 
দেন) আমি যদি যাই উত্তরে, তিনি চলেন দক্ষিণে। গঙ্গার 
দিকে গেলেই একবার জলে নামিয়া৷ সীতার দেওয়া চাই। 
গঙ্গায় কুমীর ভাগসিতেছে দেখিয়! তিনি সীতার কাটিয়া তাহাকে ' 
ধরিতে যান, আমি তীরে থাকিয়া কেবল ডাক পাড়ি আ'র হায় 
হায় করি, একবার ফিরিয়াও চাহেন না। এইরূপ তার লীলা । 
রাস্তায় ছোট বালক-বালিকা দেখিয়া মুখভঙ্গী করিয়া! তাহাদিগকে 
৭ 


৯৮ ঠাকুর হরিদান 


ভয় দেখান এবং যেন আক্রোশ করিয়া মারিবার জন্য তাহাদিগের 
পশ্চাৎ দৌড়াইতে থাকেন। ফলে শিশুদের পিতামাতা হাতে 
ঠেঙ্গা লইয়া ঠাকুরকে মারিতে আইসে। আমি জজ হাতে 
পায়ে ধরিয়৷ নিরস্ত করিয়া পাঠাই। কত বা বলিব; গোয়ালারা 
রাস্তা দিয়া যায়, আর এই ঠাকুরটি গিয়। তাহাদের দ্বত-দধি 
লইয়া! একেবারে লম্বা দৌড়! তাহার নাগাল না পাইয়া উহার 
আমাকেই আসিয়া ধরে। মাঠে পরের গাবী চরিতেছে, তিনি 
যাইয়া তাহার বাঁটে মুখ লাগাইয়া ছুগ্ধ পান করিতে লাগিলেন । 
কখন বা একটা ষাঁড়ের পিঠেই চড়িয়া বসিলেন। সে বেচারি 
শিঙ্‌ নাড়িয়া লম্কে-ঝন্ফে ছুটিল, আর তিনি তার পিঠের উপরে 
থাকিয়া পা দোলাইয়া বলিতে লাগিলেন-__“এই দেখ্‌, আমি 
মহাদেব । 

এই ততার কীন্তি। তার পর, আমি যদি একটু বুঝাইতে 
যাই, তবে আমাকে যাহা বলিবার, তাহা ত বলেনই, অধিকন্তু 
তোমাকে গালি দিয়া বলেন--“তোমার অদ্বৈত আমার কি 
করিতে পারে ? আর তুমি যারে মহাপ্রভু মহাপ্রভু বল, সেই 
চৈতন্যই বা আমার কি করিতে পারে % আমি এ সকল কথা 
মনে মনে রাখি, কাহাকেও বলি না। ইহার বুদ্ধির দোষে 
আজ যে ছুই মাতালের হাতে পড়িয়াছিলাম! তোমার কৃপা 
ছিল, তাই ভাগ্যে ভাগ্যে প্রাণ লইয়া! আসিয়াছি।” 

ভঙ্গী করিয়া কথা বলিতে শ্রীঅদ্বৈতও কম পাত্র ছিলেন 
না। তিনি ভরিদাসঠাকুরের ব্যাজজ্তরতি শুনিয়া হাসিয়া উত্তর 


সঞ্চম পরিচ্ছেদ ৯৯ 


করিলেন-_“মাতালকে নাম শুনাইতে গিয়াছিলেন, উপযুক্তই 
হইয়াছে । মগ্ভপের সহিত মগ্াপের সঙ্গ হওয়াই স্বাভাবিক । 
ইনি যেমন মাতাল, তেমনি গিয়াছিলেন আর ছুই মাতালের সঙ্গ 
করিতে । কিন্তু, হরিদাস! তুমি নৈঠিক হইয়া সেই সঙ্গে 
গেলে কেন? আমি এই নিত্যানন্দের চরিত্র ভালরূপই জানি । 
দেখিবে, দু'দিন পরে এই ছুই জনকে লইয়। নিমাই নিতাই 
একত্রে নাচিবেন। সব একাকার হইতে আর বিলম্ব নাই। 
চল, এই বেলা তুমি আর আমি জাতি লইয়া পলাই ।” 

“দেখ কালি সেই ঢই মদ্তপ আনিয়া, 

নিমাই নিতাই হুই নাচিবে মিলিয়া। 

একাকার করিবেক এই ছুই জনে, 

জাতি লয়ে তুমি আমি পলাই যতনে ।” 

( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 
কিছু দিন পরে জগাই-মাধাই, যে পথে মহাপ্রভু নিত্য 

গঙ্গান্নানে যাইতেন, তাহারই নিকটবর্তী স্থানে আসিয়৷ আড্ডা 
করিল। সে স্থান মহাপ্রভুর বাটা হইতে বেশী দূর নয়। 
সকলে তটস্থ। উহাদের ভয়ে সন্ধ্যার পর কেহ ঘরের বাহির 
হন না। শ্রীগৌরাঙ্গ যখন রাত্রিকালে ভক্তগণের সঙ্গে মিলিয়া 
কীর্তন করেন, তখন উহার! বাড়ীর বাহিরে থাকিয়া কীর্তন শুনে, 
আর নেশার ঝৌকে মৃদজ-করতালের তালে তালে নাচে, আর 
হৈ হৈ করে। মহাপ্রভু যখন প্রাতে গঙ্গান্নানে যান, তখন 
জগাই-মাধাই তাহার নিকট যাইয়া বলে--“ওহে নিমাই পণ্ডিত ! 


১০০ ঠাকুর হরিদাস 


বেশ ত গানের দল করিয়াছ ! বলিয়া রাখিলাম, একদিন 
আমাদের বাড়ী যাইয়! একপালা মঙ্গলচণ্তীর গান: গাইতে 
হইবে। কিন্তু গায়েনগুলা ভাল হওয়৷ চাই । আর যাঁহ! যাহা 
দরকার, সে সব আমরা যেখানে পাই, শগানিয়া যোগাড় 'করিয়। 
দিব।” মহাপ্রভূ উহার্দিগকে দেখিয়! একটু দূরে দূরে থাঁকিয়া 
চলিয়া যান। 

একদিন নিত্যানন্দ নগরভ্রমণ করিয়া, বোধ হয় ইচ্ছা 
করিয়াই, রাত্রিকালে সেই পথ দিয়! মহাপ্রভুর বাড়ীতে 
ফিরিতেছেন, এমন সময়ে পথে জগাই-মাধাইয়ের সঙ্গে দেখা । 
আজ হরিদাস ঠাকুর সঙ্গে ছিলেন না, নিতাই একলা । 
জগাই-মাধাঁই নিত্যানন্দের সন্গ্যাসীর বেশ দেখিয়া বলিল-_-“তুমি 
কে £” নিতাই বলিলেন_-“আমার নাম অবধৃত।” নিত্যা- 
নন্দের কথা শেষ হইতে না হইতেই “আরে, সে দিনকার 
সে বেটা রে, সে বেটা” বলিয়াই মাধাই একটা ভাঙ্গা 
কলসীর কান্ধা মাটা হইতে তুলিয়া লইয়া নিত্যানন্দের কপালে 
ছুঁড়িয়া মারিল। দরদর ধারে রক্ত পড়িতে লাগিল । নিতাই- 
য়ের সে দিকে ভ্রক্ষেপ নাই। আজ নিতাইচাদ উহাদিগকে 
উদ্ধার করিতেই আসিয়াছেন, মার খাইয়াও প্রেম বিলাইবেন 
বলিয়াই আসিয়াছেন। প্রেমে বিহ্বল নিত্যানন্দ সেই কঠোর 
আঘাতৃকে পুষ্পাঘাত তুল্য জ্ঞান করিলেন, এবং আপনার 
শত্রকে কোল দিবার জন্য বাহু প্রসারিয়া অগ্রসর হইয়! 
বলিলেন-_ 


সগডম পরিচ্ছেদ . ১০১ 


“মাধাই রে! মেরেছিম মেরেছিস কলসীর কানা, 
ওরে, তাই বলে কি প্রেম দিব ন৷ ?' 

“আয় ভাই! বুকে আয়! একবার মেরেছিস, না হয় 
আবার মারু, তাহাতে আমার দুঃখ নাই । কিন্তু এ মুখে একটি- 
বার হরি বল্‌। তোদের মুখে হরিবোল শুনিবার জন্য আমি 
বহুদুর হইতে আসিয়াছি। তোর! দুভাই হরি বলিয়া! আমাকে 
কিনিয়া নে। হরি ভজিলে, আমি বিনামূলে তোদের কাছে 
বিকাইব । 

মানুষ না দেবতা ? ইহা কি মানুষে পারে? .এমন দারুণ 
প্রহারেও নিতাইয়ের বদন প্রসন্ন, নয়নে করুণার ধারা । আর 
শত্রুকে আলিঙ্গন করিবার জন্য পরিসর-বক্ষ অগ্রসর ও ভুজদয় 
প্রসারিত, মুখে হরিনাম! পাঠক, একবার চাহিয়া দেখ-- 
করুণার সাগর নিতাইটাদকে দেখ, সর্ববাঙ্গে যেন করুণার ঢেউ 
খেলিয়া যাইতেছে । মরি মরি! কি ছুলর্ভ দর্শন। নিত্যা- 
নন্দের শরীর বুঝিবা রক্তমাংসের শরীর নহে। কেমন 
করুণামাখ। মিপ্ধ কমনীয় কান্তি । নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের করুণা- 
রাশি যেন মুগ্তি ধরিয়। আজ নদীয়ার রাজপথে অবতীর্ণ! অক্রোধ 
পরমানন্দ নিতাই চক্ষের জলে ভাসিয়া, করুণাঁ-কাতর দৃষ্টিতে 
জগাই-মাধাইয়ের পানে চাহিয়! আবার বলিলেন, 

“ভাই রে! 
বল কৃষ্ণ কহ রুষ্ণ লও কৃষ্ণ নাম, 
রূষ্ণ মাতা কৃষ্ণ পিত। কৃষ্ণ ধন প্রাণ” 


১০২ ঠাকুর হরিদাস 


নিতাইয়ের প্রেমে একটি পাঁধাণ গলিল-_-জগাইর প্রাণ 
দ্রব হইল। মাধাই পুনর্ববার কলপীর কানা ভুলিয়! নিআযনন্দকে 
মারিতে উদ্ত হইলে জগাই তাহার হাত ধরিয়া ফেলিলী, এবং 
বলিল-_“মাধাই ! এই দেশাস্তরী সন্ন্যাসীকে মারিয়া কিলাভ 
চাহিয়া দেখ, ইহার অঙ্গে রক্তের ধারা বহিতেছে, তথাপি 
হাসিমুখে হরি নাম করিতেছেন ! দেখ দেখ, আমাদিগকে 
প্রেমভরে আলিঙ্গন করিবার নিমিত্ত বাহু প্রসারিয়া আছেন ! 
আহা ! হরিনাম যে এত মধুর, তাহা ত ভাই আগে জানি নাই। 
আয় ভাই !. আমরাও হরি বলি। কলসীর কান্ধা ফেলিয়া দে।” 

শ্রীগৌরাঙ্গ লোকমুখে নিত্যানন্দের বিপদের কথা শুনিয়া 
তগ্ক্ষণাৎ সাঙ্গোপাঙ্গে আসিয়া সে স্থানে উপস্থিত হইলেন । 
নিতাইয়ের দেহে শোণিত-পাত দেখিয়া তিনি শ্ভির থাকিতে 
পারিলেন না । চিত্র চক্র” বলিয়া ঘন ঘন ুষ্কার করিতে 
লাগিলেন। মহতের অতিক্রম, ভক্তের গ্রানি তিনি কেমন 
করিয়া সহিবেন ? তাই স্দর্শন-চক্রকে স্মরণ করিলেন। 
প্রেমদাতার শিরোমণি নিতাই তাহ! দেখিয়া বলিলেন__-“ও কি 
কর প্রভু? আমার কথা শুন, আমার কথা শুন। এই 
জগাইয়ের কোনও দোষ নাই। মাধাই দ্বিতীয়বার মারিতে 
উদ্ভধত হইলে জগাই আমাকে তাহা হইতে প্রাণে রক্ষা 
করিয়াছে। দৈবে একটু রক্ত পড়িয়াছে, কিন্তু আমি ব্যথা পাই 
নাই। প্রভু, তুমি ক্ষান্ত হও, ইহাদিগকে ক্ষমা কর । এই দুই 
জনের শরীর আমাকে ভিক্ষা দাও 1” 


সপুম পরিচ্ছেদ ১৩৩ 


নিত্যানন্দ শ্রীগৌরাঙ্গের প্রা অপেক্ষা প্রিয়। জগাই 

তাহার প্রাণ রক্ষা করিয়াছে শুনিয়া, মহাপ্রভু জগাইকে ধরিয়া 
কোল দ্দিলেন, এবং বলিলেন-_“জগাই রে ! আজ নিত্যানন্দের 
প্রাণ রাখিয়া তুই আমাকে কিনিয়া নিলি। কৃষ্ণ তোর কুশল 
করুন। আমি তোকে আশীর্ববাদ করিতেছি, তোর প্রেমভক্তি 
লাভ হউক ।” 

“জগায়েরে বলেন কৃষ্জ কপা করুন তোরে, 

নিত্যানন্দ রাখিয়! কিনিলে তুই মোরে । 

যে অভীষ্ট চিত্তে দেখ তাহা তুমি মাগ, 

আজি হৈতে হউ তোর প্রেমভক্তি লাভ ।*. 

( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


জগাইয়ের প্রতি মহাপ্রভুর কৃপা দেখিয়া তক্তমণ্ডলী 
হরিধবনি করিয়া উঠিলেন। শ্রীগৌরাঙ্গ জগাইকে কিছুকাল 
বক্ষে ধারণ করিয়৷ রহিলেন । তীহার শক্তিসঞ্চারী স্পর্শ জগাই 
সহা করিতে পারিল না, তাহার শক্তি সে ধারণ করিতে পারিল 
না। জগাই সংন্ভ্তাহীন অবস্থায় মহাপ্রভূর কোল হইতে খসিয়। 
তীহার চরণমুলে পতিত হইল । পরে সংজ্ঞালাত করিয়া কাদিয়া 
লোটাপুটি করিতে লাগিল । আহা ! কি ভাগ্য ! মহাপ্রভুর কি 
দয়া! স্পর্শমণির ধণ্ম এই যে, সেস্পর্শ করিবামাত্র লৌহস্মর্ণ 
হয়। স্পর্শমণি লৌহের ভাল মন্দ বাছে না। লৌহ্‌ মরহত্যা 
করিয়া নরশোণিতে কলঙ্কিতই হউক, কিংবা ঠাকুর-সেবার 
কাধ্যেই ব্যবহৃত হইয়া থাকুক, যাছাই হউক না কেন, একবার 


১৯৪ ঠাকুর হরিদাস 


পরশ-মণির পরশ পাইলেই 'সে খাঁটি সোণা! আজ জ. সির 
গোৌরাঙ্গ-পরশ-মণির স্পর্শে জগাই খাঁটি সোণা হইয়। গেল। 
মাধাই অবাক্‌ হইয়া দড়াইয়া সমস্ত দেখিতেছিল। জগ্মাইয়ের 
পরিবর্তনের তরঙ্গ আসিয়! তাহাকে স্পর্শ করিল। মাধাই এক 
অচিস্তনীয় শক্তিতে অবশ হইয়1 মহাপ্রভুর চরণে পড়িয়া কাঁদিতে 
লাগিল। বলিল, “দোহাই প্রভু, আমাকে কৃপা কর। আমরা 
জগাই-মাধাই দুই ভাই চিরকাল এক সঙ্গে পাপ করিয়াছি। 
আজ জগাই তরিয়া গেল, আর আমি একলা পড়িয়া রহিলাম। 
ঠাকুর! আমাকেও কৃপা করিতে হইবে, আমি তোমার চরণে 
পড়িয়া রহিলাম।৮ 
"ছুই জনে এক ঠাঞ্জি কৈল প্রভু পাপ, 
অনুগ্রহ কেন প্রভূ কর ছুই ভাগ।” 
মহাপ্রভু বলিলেন--“তোমাকে কৃপা করিবার শক্তি আমার 
নাই। তুমি নিত্যানন্দের অঙ্গে রক্তপাত করিয়া তাহার স্থানেই 
অপরাধ করিয়াছ। তীহার চরণে গিয়। পড়। বদি তিনি কুপা 
করেন, তবেই তোমার উদ্ধার হইবে, নতুবা উদ্ধার নাই।” 
মাধাই যাইয়া নিত্যানন্দের চরণ ধরিয়। পড়িল । 
“পাইয়া প্রভুর আজ্ঞা মাধাই তখন, 
ধরিল অমূল্য ধন নিতাই-চরণ।” 
(্রীচৈঃ ভাঃ) 
মহাপ্রভু নিত্যানন্দকে বলিলেন-_শ্রীপাদ ! তুমি করুণার 
সাগর । মাধাই তোমার শ্রীচরণ আশ্রয় করিল। ইহাকে 


সপ্তম পরিচ্ছেদ ১০৫. 


ভুমি কৃপা কর।” নিত্যানন্দ বলিলেন-_“প্রভো ! কেন আর 
ছলনা করিতেছ ? ইহাকে উদ্ধীর করিয়া লও । আমি ত ইহার 
অপরাধ পুর্ব্বেই ক্ষমা করিয়াছি। এক্ষণে তোমার সাক্ষাতে 
বলিতেছি যে, কোন জন্মে যদ্দি আমার কিছুমাত্র স্থকৃতি থাকে, 
তবে তাহা আমি মাধাইকে দিলাম। ইহার সমস্ত অপরাধ 
আমি লইলাম। তুমি ছলন! ছাড়িয়া ইহাকে কৃপা কর।” 
মহাপ্রভু বলিলেন--“শ্রীপাদ ! যদি ইহার সমস্ত অপরাধ 
ক্ষম] করিলে, তবে এক্ষণে আলিঙ্গনদানে ইহাকে কৃতার্থ কর» 
অক্রোধ পরমানন্দ নিতাই মাধাইকে হৃদয়ে ধরিয়া শক্তি- 
সঞ্চার করিলেন। সেই মুহূর্তেই তাহার সকল বন্ধন মোচন 
হইল। ভক্তের! দেখিলেন যে, মাধাই সর্ববশক্তিসমন্থিত 
হইল! 
“মাধাইর দেহে নিত্যানন্ন গ্রবেশিলা, 
সর্বশক্তিসমন্বিত মাধাই হইল11% 
(শ্রীচৈঃ ভাঃ) 


জগাই-মাধাই ছুই ভাই গৌর-নিত্যানন্দের চরণ আশ্রয় 
করিয়া অনুতাপসহকারে কীদিতে লাগিল । তখন মহাপ্রভু 
জগাই-মাধাইকে সন্দোধন করিয়া বলিলেন--“জগাই-মাধাই ! 
অস্ত হইতে তোমর৷ ছুই ভাই নিষ্পাপ হইলে । তোমরা যদি" 
পুনরায় পাপ না কর, তাহা হইলে তোমাদিগের জন্মজম্মাস্তরের 
যত পাঁপ আছে, সে সমস্তের ভার আমি গ্রহণ করিলাম । আর 
ভয় নাই। নিশ্চিন্ত হইয়! শ্রীকঞ্তজন কর। অগ্য হইতে 


১০৩ ঠাকুর হরিদাস 


আমি তোমাদের মুখে আহার করিব এবং তোমাদিগের দ্বই- 
জনের দেহে আমি বিরাজ করিব '” 

"কোটী কোটা জন্মে যত আছে পাপ তোর, 

আর যদি না করিস্‌ সব দায় মোর। 

তো দোহার মুখে মুগ করিব আহার, 

তোর দেহে হইবেক মোর অবতার ।” 

( শ্রীচৈঃ ভাঃ) 
জগাই-মাধাই মহাপ্রভুর আশ্বাস-বাক্য শুনিয়া, তাহার এমন 
কৃপা দেখিয়া, আনন্দে মুচ্ছিত হইয়া পড়িল। মহাপ্রভু ভক্ত- 
গণকে বলিলেন, “এখন এই ছুইজনকে তুলিয়া লইয়া চল। গৃহে 
যাইয়া ইহাদ্দিগকে লইয়া আজ মহাকীর্ভন করিব, এবং ইহার্দিগকে 
জগতের উত্তম করিয়া লইব। এখন ইহাদিগের স্পর্শমাত্র 
যাহার গঙ্গান্নান করে, অতঃপর তাহারা এই ছুই জনের স্পর্শ 
গঙ্গান্নান-তুল্য জ্ঞান করিবে ।” 
"এই তুই পরশে ষে করিল গঙ্গান্নান, 
এ দোহারে বলিবে সে গঙ্গার সমান ।” 
(শ্রাচৈঃ ভাঃ) 
ভক্তগণ জগাই-মাধাইকে অচেতন অবস্থায় ধরাধরি করিয়। 

মহাপ্রভুর বাড়ীতে লইয়া গেলেন। মহাপ্রভূকে বেষ্টন করিয়া 
'জ্রীঅদ্বৈত, নিত্যানন্দ, হরিদাস, বক্রেশ্বর, শ্রীবাস, গদ্াধর, 
গঙ্গাদ্ণস, পুগুরীক বিষ্যানিধি, মুকুন্দ, বাসুদেব ও মুরারিগুপ্ত 
প্রভৃতি মহাসভা মিলাইয়া বসিয়াছেন। কিছুক্ষণ পরে জগাই- 
মাধাই সংজ্ঞালাভ করিলে, মহাপ্রভু সকলকে বলিলেন-_ 


সপ্তম পরিচ্ছেদ ১০৭ 


“ইহারা ছুই জন তোমাদিগের যাঁর যার কাছে যে যে অপরাধ 
করিয়াছে, তৎসমুদয় তোমরা ক্ষমা কর।” ছুই ভাই কাদিয়। 
কাদিয়া একে একে সকলের চরণে পড়িয়া ক্ষমা ভিক্ষা করিতে 
লাগিল । ভক্তগণ তাহাদিগকে প্রাণ খুলিয়া আশীর্বাদ করিলেন । 
তখন মহাপ্রভু বলিলেন--“ভক্তগণ! তোমরা অতঃপর এই 
দুই জনকে আর পাপী জ্ঞান করিও ন!। অগ্যাবধি ইহারা 
নিষ্পাপ হইল । জানিও, ইহাদিগকে শ্রদ্ধা করিলে আমাকেই 
শ্রদ্ধা করা হইবে । এক্ষণে সংকীর্ভন আরম্ভ কর।” 

অগ্ভ কীর্তন আরম্ভ হইতে না হইতেই মহাপ্রভু নৃত্য করিতে 
উঠিলেন। সকলের উচ্ছ্বাসপুণণ হরিধ্বনিতে দশদিক্‌ পূর্ণ 
হইল। মহাপ্রভুর সঙ্গে সঙ্গে নিত্যানন্দ, শ্রীঅদ্বৈত, হরিদাস, 
বক্রেশ্বর প্রভৃতি উদ্দপ্ড নৃত্য আরন্ত করিলেন। আজ গৌরভক্ত- 
বৃন্দের আনন্দের সীমা নাই। সকলেই নাচিতেছেন, সকলেই 
আনন্দাশ্রু বর্ণ করিতেছেন। তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে আর 
নাচিতেছেন-_জগাই-মাধাই ছুই ভাই । তীাহাদিগের প্রাণের 
ভিতরে আজ এক নূতন আনন্দময় রাজোর দ্বার খুলিয়া! গিয়াছে । 
উভয়ে নাচিতেছেন, উচ্চৈঃম্বরে হরিবোল বলিতেছেন, আর 
হুনয়নে যেন স্থুরধুনী বহিয়া যাইতেছে । ছুরম্ত জগাই-মাধাই 
আজ হরিনামে হার মানিল। নিতাই-গৌরাঙ্গের প্রভাব দেখিয়! 
পণ্ডিতের নবদ্বীপ বিস্ময়ে স্তস্তিত হইল ! 

“্ছুরস্ত সেই জগাই-মাধাই হার মেনেছে হরিনামে, 
হরি হরি বলে ভাসিতেছে গৌরপ্রেমে ।” 


১০৮ ঠাকুর হরিদাস 
এস্থলে মনে একটা প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, নবদ্বীপ এত 


জন্তানী, এত পণ্ডিত জন-_-এত ভাল ভাল লোক থাকিতে সেই 
দুরাচারী জগাই-মাধাই এত সহজে ভক্তির পথে চি 
করিয়৷ ? তাহার ছুইজন না করিয়াছে এমন দুক্ষন্্ন নাকি নাই। 
এমন কি তাহাদিগের উদ্ধারের অব্যবহিত পূর্ববর্তী ঘটনাও 
একটি মহা গুরুতর অপরাধেরই কনম্ম। কি? না পরম 
কারুণিক শ্রীমন্নিত্যানন্দের অঙ্গে রক্তপাত ! আমাদের গৌর- 
নিতাইয়ের দয়ার ভঙ্গীটা দেখিয়া তাহাদের বলিহারি যাই। 
এত লোক থাকিতে সকলের আগে দয়ার উপযুক্ত পাত্র হইলেন 
কিন! সেই সর্ববজন-দ্বণিত ও সকল দ্ুক্ষম্মের নায়ক জগাই আর 
মাধাই! কিন্তু ভাই, ইহার অবশ্য একটা মীমাংসা আছেই 
আছে। তাহাদের চক্ষু আর তোমার-আমার চক্ষু একরূপ নয়। 
বাহিরের সাফ-সাফাই দেখিয়া তূমি-আমি যাহাকে স্ুপাত্র মনে 
করি, তাহারা হয়ত সেই ব্যক্তির অন্তরের লুক্কায়িত গলদ্‌ 
দেখিয়া তাহাকে নিতান্ত অপাত্র বলিয়াই জানেন। একটা 
কথা এই যে, সোজা-সরল প্রাণ ভক্তিপথের একটা মস্ত সম্বল। 
প্রাণটি সরল না হইলে তুমি একজন গণ্য-মান্য দশকর্্মান্বিত 
ব্যক্তি হইয়াও এপথে সহজে অগ্রসর হইতে পারিবে ন|। 
একজন স্রাসক্ত মাতালকে দেখিয়া হয়ত তুমি ঘ্বণাভরে নাসিক 
কুঞ্চিত করিয়া থাক । কিন্তু সেব্যক্তি যদি শাদা-সিদে সরল 
লোক হয়, তবে জানিও, তাহার পক্ষে ভক্তি লাভ কর! যত 
সহজ, একজন কুটিল, পরনিন্দক ভব্য-সব্য পণ্ডিতের পক্ষে উহা 


সগুম পরিচ্ছেদ ১০৪ 


তত সহজ নহে । জগাই-মাধাইয়ের*উদ্ধারের কথা বলিতে গিয়া 
শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর কি বলিয়াছেন, শুন-_ 


“সর্ব পাপ সেই ছুই শরীরে জন্মিল, 
বৈষ্ঞবের নিন্দা-পাপ সবে না হইল । 
অহনিশ মগ্যপের সঙ্গে রঙ্গে থাকে, 
নহিল বৈষ্ণব-নিন্দা এই সব পাকে । 
ষে সভায় বৈষ্বের নিন্দ! মাত্র হয়, 
সর্ব ধর্ম থাকিলেও তার হয় ক্ষয়। 
সন্গাসী-সভায় যদি হয় নিন্দা-কম্মন, 
মস্তপের সভা হৈতে সে সভা অধন্ম । 
মগ্যপের নিষ্কৃতি আছয়ে কোন কালে, 
পর চর্চকের গতি কভু নাহি ভালে ।” 
(শ্রীচৈঃ ভাঃ ) 


হরিদাস ঠাকুর যত দিন নবদ্ধীপে ছিলেন, তত দিন তিনি 
নিত্যানন্দ প্রভূর সহিত মিলিয়া৷ হরিনাম প্রচার করিতেন। 
কারণ, উহা! শ্রীগৌরাঙ্গের আদেশ । মহাপ্রভূর হরিসংকীর্তনের 
মধ্যেও তাহার ভক্তিবিলসিত উজ্জ্বল মুর্তি আমরা সর্বদা! দেখিতে 
পাই। কিন্তু এখানে তিনি নিজে প্রধান হইয়া কিছুই করেন 
নাই। এজছ্য এ সময়ে তাহার জীবনের তেমন উল্লেখযোগ্য 
ঘটন! পাওয়া যায় না। নবদ্বীপে তাহার নিজের কিছুই করিবার 
ছিল না। যাহা কিছু করিয়াছেন, মহাপ্রভূর আত্ঞাধীন হইয়া। 
তিনি কেবল চক্ষু ভরিয়া শ্রীগৌরাঙ্গের মধুর লীলা দর্শন 


১১৩ ঠাকুর হরিদাল 


করিতেন, আর প্রাণ ভরিয়। “তাহা সন্তোগ করিতেন । বস্তুতঃ 
শ্রীগৌরাঙ্গের লীলারসে তিনি আপনার ব্যক্তিত্ব একবারে 
ডুবাইয় দিয়াছিলেন। 
বিনয়, সৌজন্য ও তৃণাদপি স্থুনীচের ভাবটা হরিদীসঠাকুরের 

সারা জীবনে পরিলক্ষিত হয়। ভক্তগণ ও প্রভু তিন জন 
তাহাকে কত মধ্যাদা দিতেন ও কত আদর করিতেন। কিন্তু 
তাহাতে তিনি আরও জড়সড় হইয়া থাকিতেন। কিসে কখন 
কাহার মধ্যাদাভঙ্গ হয়,এই ভয়েই তিনি সর্ববদ। তটম্থ থাকিতেন। 
মহা প্রভূ দণ্ডে দণ্ডেই হরিদাস ঠাকুরের খবর লইতেন। প্রভু 
আহারে যাইতৈছেন, তখন “হরিদাস কোথায়” বলিয়া তাহাকে 
ডাকাইয়! আনিলেন। কিন্ত্ত হরিদাস একাস্ত কাতরতার সহিত 
বলিলেন যে, তিনি অধম, সকলের সঙ্গে এক পংক্তিতে বসিয়! 
আহার করিতে যোগ্য নহেন, সকলের আহারান্তে বাহিরে 
বসিয়া এক মুষ্টি প্রাসাদ পাইবেন । 

“হরিদাস বলে মুঞ্ি পাপিষ্ঠ অধম, 

বাহিরে এক মুষ্টি পাছে করিব ভোজন ।” 

(শ্রী চৈঃ চঃ) 


যেরূপে হরিনাম গ্রহণ করিলে কৃষ্ণপদে প্রেম জম্মে, তাহার 
লক্ষণ শ্রীমন্মহাপ্রভূ বিখ্যাত “তৃণাদপি” শ্লোকে বলিয়াছিলেন। 
হরিদাস ঠাকুর যেন সেই শ্লোকোক্ত লক্ষণসমষ্টির মুণ্তিমান্‌ 
বিগ্রহ ছিলেন। শ্লোকটি এই-_ 


অষ্টম পরিচ্ছেদ 


“তৃণাদাপ সুনীচেন তরোরিব সহিষুনা।  ডূবিলেন। 

অমানিনা মানদেন কী্তনীয়ঃ সদা! হরিঃ ॥৮ ্প্রমা- 

শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোম্ব।মী পয়ারে ইহার সুন্দর স্থস্প্টী 
ব্যাখ্যা! করিয়াছেন-_ 


“উত্তম হৈয়া আপনাকে মানে তৃণাধম, 
দ্রই প্রকার সহিষ্ণুতা করে বুক্ষসম। 
বঙ্গ যেন কাটিপেহ কিছু না বোলয়, 
শুকাইয়া! মৈলে কারে পানী না মাগয়। 
যেই যে মাগদ্নে তারে দেয় আপন ধন, 
ঘন্ম বৃষ্টি সহে আনের করয়ে পোষণ । 
উত্তম হৈয়! বৈষুব হবে নিরভিমান, 
জীবে সম্মান দিবে জানি কৃষ্ণ-অধিষ্ঠান। 
এইমত হৈয়। যেই কৃষ্ণ নাম লয়, 
শ্রীরুঞ্ণ-চরণে তার প্রেম উপভয় ।” 


টস 


অক্টম পাঁরচ্ছেদ 


নীলাচলে 
শ্রীগৌরাঙ্গ নবদ্বীপ-লীল! সাঙ্গ করিয়। সন্ন্যাসগ্রহণাস্তর যখন 
নালাচলে যাত্রা করেন, তখন তীহার সঙ্গে প্রীনিত্যানন্দ, দামোদর 
পণ্ডিত, জগদানন্দ পণ্ডিত ও মুকুন্দ দত্ত, এই চারিজন 
গিয়াছিলেন। মহাপ্রভু আর কাহাকেও সঙ্গে নিলেন না। 


ঠাকুর হরিদাস 


ঠাকুর কাঁদিয়া বলিলেন, “প্রভো ! ভুমি ত নীলাচলে 
। আমার গতি কি হইবে ? আমি তোমাকে? চাডিয! 
কেমন করিয়া বাঁচিব ?” 
শ্রীমন্মহাপ্রভূ তাহাকে আশ্বাস দিয়া বলিলেন,__- 
“তোমা লাগি জগন্নাথে করিব নিবেদন, 


তোম! লঞ্! যাব আমি শ্রীপুরুষোত্তম 1” 
( শ্রীচৈঃ 52) 
শ্রীগীরাঙ্গ নীলাচলে যাইয়। কিছুকাল অবস্থানের পর তীর্থ- 
দর্শনোপলক্ষে দাক্ষিণাত্যে গমন করেন! বগসরাধিক কাল 
দক্ষিণের সমস্ত তীর্থ পর্যটন করিয়া পুনরায় নীলাচলে প্রত্যাবৃত্ত 
হইলে, গৌড়ীয় তক্তগণকে তথায় আসিবার জন্য লোকমুখে 
ংবাদ প্রেরণ করেন। তাহার আজ্ঞা পাইয়া, ভক্তগণ আনন্দে 
উম্মত্ত হইয়! শ্রীঅদ্বৈত প্রভূকে অগ্রণী করিয়া নীলাচলে 
মহাপ্রভূকে 'দেখিতে আসিলেন। তীহাদিগের সঙ্গে হরিদাস 
ঠাকুরও আসিলেন। মহাপ্রভু কাশী মিশরের এক উদ্ভান-বাটীতে 
অবস্থান করিতেছিলেন, ভক্তগণ যাইয়া তথায় উপস্থিত হইলেন । 
হরিদাসঠাকুর তাহার স্বভাব-স্থলভ সঙ্কোচ বশতঃ মহাপ্রভুর 
বাটীতে ন! যাইয়া বাহিরে পথের পার্থ বসিয়া নাম করিতে 
াগিলেন। 
“মিলন স্থানে আসি গ্রভূরে না মিলিলা, 


রাজপথ প্রান্তে দুর্সে পড়িয়া রহিল ।* 
( ভ্ীচৈঃ চ:) 


অষ্টম পরিচ্ছেদ ১১৩ 


ভক্তগণ মহাপ্রভুকে দর্শন করিরা আনন্দ-সাগরে ডুবিলেন। 
মহাপ্রভু সর্ববপ্রথমে শ্রীঅদ্বৈতপ্রভুর সহিত নমস্কারপ্রেমা- 
লিঙ্গন পূর্বক একে একে সর্বব-বৈষ্ণবের সহিত ইফ্টগোষ্টী 
করিলেন । কিন্তু হরিদাস ঠাকুরের না৷ আসিবার কারণ জিজ্ঞাসা 
করিয়া যখন জানিতে পারিলেন যে, তিনি আসিয়া পথের ধারে 
বসিয়া রহিয়াছেন, তৎ্ক্ষণাণ্ড তিনি তাহাকে আনিতে লোক 
পাঠাইলেন। লোকেরা হরিদাসঠাকুরের নিকট যাইয়া মহাপ্রভুর 
আজ্ঞা “জানাইল। কিন্তু হরিদাসঠাকুর বলিলেন__“আমি 
নীচজাতি, শ্রীমন্দিরের নিকট দিয়া যাইতে আমার অধিকার 
নাই। যদি শ্রীমন্দির হইতে কিছু দুরে নির্জনমত একটু স্থান 
পাই, তবে সেখানেই পড়িয়া থাকিব, এক প্রকারে দিন কাটিয়া 
যাইবে । এ অঞ্চলে থাকিলেই হয় ত কখন অলক্ষিতে জগন্নাথের 
কোন সেবককে স্পর্শ করিয়। অপরাধের ভাগী হইব, এই 
আশঙ্কা । আমার ইচ্ছা যে, একটু দুরে যাইয়। থাকি, তাহা 
হইলে সে ভয় থাকিবে না।” 

লোকেরা যাইয়। সে কথা মহাপ্রভুকে জানাইল। হরিদাস 
ঠাকুরের এইরূপ বিনয়, সাবধানতা ও মধ্যাদাবোধ দেখিয় 
মহাপ্রভু মনে মনে স্থুখী হইলেন এবং তাহাকে একটি স্বতন্ত্র 
স্থানে বাসা দিবার জন্য সংকল্প করিলেন । 


“এই কথা লোক গিয়া! প্রভুরে কহিল, 
শুনি মহাপ্রভু মনে বড় সুখ পাইল।» 
(ভ্রীচৈঃ চঃ) 
৮ 


১১৪ ঠাকুর হরিদাস 


ধাহার1 বিধি-নিষেধের অতীত নিক্কাম প্রেম-ভক্তি-যোগ লাভ 
করিয়াছেন, তাহারা শ্রেক্ঠ অধিকারী সন্দেহ নাই। শ্রীমন্মহা প্রভূ 
জাতিনির্ব্বশেষে এইরূপ উন্নত অধিকারী ভক্তগণের ।সহিত 
সর্বদা প্রেমে গলাগলি করিয়াছেন, কিন্তু তথাপি বর্ণ ও 
আশ্রমের মর্যযাদ1! কখনও ক্ষুণ্ন করেন নাই । এই কারণে তীহার 
অনুগত বৈষ্ঞবগণ সকলেই মর্ধ্যাদাবোধসম্পন্ন ছিলেন। কোনও 
সমাজের, সম্প্রদায়ের অথবা ব্যক্তির মধ্যাদালঙ্ঘন তাহাদিগের 
নিকট গুরুতর অপরাধের কার্যা বলিয়। বিবেচিত হইত । 

এ.দিকে কাশীমিশ্র পূর্ব হইতেই ভক্তগণের জন্য বাসস্থান 
ঠিক করিয়! রাখিয়াছিলেন। তাহাদিগকে আপন আপন নির্দিষ্ট 
বাসায় পৌছাইয়া সমস্ত বন্দোবস্ত করিয়া দিবার ভার গোপীনাথ 
আচার্্যের উপর পড়িল এবং ভক্তগণের সেবার বন্দোবস্তের 
ভার থাঁকিল বাণীনাথ পট্নায়কের উপর । ভাগ্যবান কাশীমিশ্র 
বৈষ্ণবগণের .নীলাচলে অবস্থানের সমস্ত বায় সমাধান করিতে 
একান্ত ইচ্ছুক হইয় মহা প্রভূর অনুমতি পূর্বেবই চাহিয়া লইয়া- 
ছিলেন। মহাপ্রভু কাশীমিশ্রকে ডাকিয়া বলিলেন__“আমার 
বাটীর নিকটবর্তী তোমার নির্জন পুষ্পোগ্ভানে যে একখানি ঘর 
আছে, তাহা আমাকে দিতে হইবে । আমার বিশেষ প্রয়োজন 
্মাছে।” তাহাতে কাশীমিশ্র বলিলেন, “ঠাকুর, তোমারই ত 
সব। আমাকে জিজ্ঞাসার আর প্রয়োজন কি ?” 

গোপীনাথ আচাধ্য মহাশয় সমস্ত বাসা সংস্কীর পুর্ববক 
পরিক্কার-পরিচ্ছন্ন করাইয়া রাখিলেন। বাণীনাথ প্রচুর পরিমাণে 


অষ্টম পরিচ্ছেদ ১১৫ 


অন্ন, পিঠা, পান! প্রভৃতি বিবিধ *মহাপ্রসাদ লইয়া মহাপ্রভুর 
বাটীতে উপস্থিত হইলেন। সমস্ত প্রস্তুত জানিয়া মহাপ্রভু 
বৈষ্ণবগণকে স্ান-আহ্বিক করিতে আপন আপন বাসায় পাঠাইয়া 
দিলেন। বৈষ্ণবগণ বিদায় হইলে শ্রীগৌরাঙ্গ আর ক্ষণকাল 
বিলম্ব না করিয়া হরিদ্াসকে দেখিবার জন্য আকুল হইয়া 
রাজপথে চলিয়া আসিলেন। আসিয়া দেখেন, হরিদাস পথের 
ধারে বসিয়৷ প্রেমানন্দে নাম-সংকীর্তন করিতেছেন, নয়নে ধার! 
বহিতেছে। মহাগ্রভুকে দেখিয়াই হরিদাস তাহার চরণে সাষ্টাঙ্গে 
পতিত হইলেন। মহাপ্রভু তাহাকে ঢুই হস্তে ধরিয়া তুলিয়া 
বক্ষে ধারণ কিলেন। উভয়ে উভয়ের প্রেমে কাঁদিয়া আকুল 


হইলেন । 
“তবে প্রভু আহল! হরিদাস মিলনে ; 


হরিদাস করে প্রেমে নাম সংকার্তনে । 
প্রভু দেখি পড়ে আগে দণ্ুবৎ জঞাা, 
প্রভু আলিঙ্গন কৈল তারে উঠাইয়! । 
দুই জনে প্রেমাবেশে করেন ত্রন্দনে, 
প্রভু-গুণে ভূত বিকল, “প্রভূ ভূত্য-গুণে 1” 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 
হরিদাস কাদিতেছেন, আর বলিতেছেন--প্রভো ! কি 
কর? কি কর? আমাকে ছুঁইলে? আমি অস্পৃশ্য অধম, 
আমাকে ছাড়িয়া দাও, ছাড়িয়া দাও ।” 
তখন মহাপ্রভু ষে উত্তর করিয়াছিলেন, সেই হৃতকর্ণ-রসায়ন 
কা গ্রান্থের প্রারস্তেই একবার বলিয়াছি, আবার বলিতেছি। 


১১৬ ঠাকুর হরিদাস 


“প্রভু কছে তোমা স্পশি পবিত্র হইতে, 
তোমার পবিভ্র ধর্ম নাহিক আমাতে। 
ক্ষণে ক্ষণে কর তুমি সর্বতীর্থে স্নান, 
ক্ষণে ক্ষণে কর তুমি যজ্ঞ, তপ, দান। 
নিরস্তর কর চারি বেদ অধায়ন, 
দ্বিজন্তাসী হৈতে তুমি পরম পাবন।» 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 


মহাপ্রভু কি হরিদাস ঠাকুরের অতিস্তরতি করিলেন ? না। 
শ্রীমন্তাগবত বলিতেছেন__ 
_ ”অহো! বত শ্বপচোহতে। গরীয়ান্‌ 
যজ্জিহ্বাগ্রে বর্ততে নাম তুভ্যম্‌ | 
তেপুস্তপন্তে জুন্বুঃ সঙ্গ রাধ্ধ্যা 
রহ্ধানৃচূর্নাম গৃণস্তি যে তে॥” 


অর্থ__ধাহার জিহ্বাগ্রে তোমার নাম বর্তমান, সে ব্যক্তি 
চগ্ডাল হইলেও পুজ্যতম। যেহেতু ধাহারা তোমার নাম করেন, 
তীাহারাই তপম্চারী তীহারাই হোমকারী, তাহারাই তীর্থন্ায়ী, 
তাহারাই সদাচারী আধ্য এবং তাহারাই বেদাধ্যায়ী। 

অডঃপর মহাপ্রভু হরিদাসঠাকুরকে সঙ্গে করিয়! কাশীমিশ্রের 
পুষ্পোদ্যানে লইয়া গিয়া সেই নির্জন গৃহে তীহাকে বাস! 
দিলেন, এবং বলিলেন,_-“তুমি এই স্থানে থাকিয়াই নামকীর্ভন 
করিঘে এবং শ্রীমন্দিরের চূড়া ও চক্র দর্শন করিবে। এই 
স্থানেই তোমার জন্য মহাপ্রসাদ আসিবে । আমি প্রত্যহ একবার 


20 ৮৫ ৎ । 11781 ৮1৯-১৮০০০ ৮৮১৫ 8$8৯)২- হক ৯৬৪ 





অষ্টম পরিচ্ছেদ ১১৭ 


আসিয়া তোমার সঙ্গ করিব” ঠাকুর হরিদাস তাহার জীবনের 
শেষ দিন পধ্যস্ত এঁ স্থানে থাকিয়া সাধন-ভজন করিয়াছিলেন। 
উক্ত স্থান এক্ষণে “সিদ্ধ বকুল” নামে প্রসিদ্ধ । হরিদাসকে 
তাহার বাসায় রাখিয়া মহাপ্রভু সমুদ্রন্সানান্তে স্বগৃহে প্রত্যা- 
গমন করিলেন। আসিয়াই অগ্রে আপন সেবক গোবিন্দের 
দ্বারা হরিদাসঠাকুরের জন্য মহাপ্রসাদ পাঠাইয়া দিলেন, পরে 
ভক্তগণ সঙ্গে নিজে প্রসাদ পাইতে বসিলেন। 

উক্ত গোবিন্দ শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরীর সেবক ছিলেন৷ তীহারই 
আদেশক্রমে মহাপ্রভু ইহাকে আপনার সেবকরুপে রাখিতে 
বাধ্য হইয়াছিলেন। 

মহাপ্রভু ভক্তবুন্দ সঙ্গে লইয়া কখন কখন কোনও কোনও 
উদ্ভানবাটীতে যাইয়া সংকীর্ভন-মহোতসব করিতেন । হরিদাস- 
ঠাকুরও সেই সঙ্গে কীর্তনে-নর্তনে যোগ দান করিতেন। কিন্তু 
ভোজনের সময় বৈষ্বগণের পংক্তি ছাড়িয়। দূরে যাইয়।, স্বতন্ত্র 
ভাবে বসিতেন। আহারের সময় উপস্থিত হইলেই মহাপ্রভু 
সর্ববাগ্রে হরিদাসঠাকুরের সন্ধান লইতেন। কিন্তু হরিদাস- 
ঠাকুর মর্ধ্যাদীলঙ্ঘনের ভয়ে কাছে ঘনাইতেন না। 


“হরিদাস” বলি প্রভূ ডাকে ঘনে ঘন, 

দূরে রহি হরিদাস করে নিবেদন । 

পাছে মোরে প্রসাদ গোবিন্দ দিবে বহিদ্বারে, 
মন জানি প্রভূ পুনঃ না বলিল তারে ।” 


( শ্ীচৈঃ চঃ) 


১১৮ | ঠাকুর হরিদাস 


জ্ীবূপের আগমন 


এই সময়ে একদিন শ্রীমন্রুপ গোস্বামী শ্রীবৃন্দাবন।হহতে 
নীলাচলে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, এবং অনুসন্ধান করিতে 
করিতে হরিদীসঠাকুরের স্থানে যাইয়া বাসা লইলেন। তিনি 
মহাপ্রভুর বাটীতে গেলেন না। এইরূপ করিবার বিশেষ 
কারণ ছিল। জাতিতে ব্রাহ্ষণ হইলেও তিনি জীবনের প্রথম 
ভাগে গৌড়ের শ্রেচ্ছ বাদশাহের চাকুরী করিবার সময় সদাচার- 
ভ্রষ্ট ও “দ্বির খাস” নামে পরিচিত হইয়াছিলেন। এ নিমিত্ত 
সামাজিক হিসাবে আপনাকে পতিত জ্ঞান করিতেন । মহাবিজ্ঞ, 
মহাদিগ্গজ পণ্ডিত ও বহু বৈষ্ণব-শান্ত্রের প্রণয়নকর্তা পূজ্যপাদ 
শ্রীরূপ গোস্বামীর এই প্রকার বিনয় এক অদ্ভুত বস্তু, সন্দেহ 
নাই। রূপ গোস্বামী মহাশয় সংস্কৃত ভাষায় “ভক্তিরসাম্মৃতসিন্ধু, 
“বিদগ্ধমাধব,”* “ললিতমাধব, 'উজ্জ্বল-নীলমণি “দানকেলি- 
কৌমুদী,, “গোবিন্দবিরূদাবলী, ও “লঘুভাগবতাম্থত' প্রভৃতি 
অসংখ্য বৈষ্ণবগ্রন্থ লিখিয়া৷ গিয়াছেন, এজন্য তিনি বৈষ্ণব 
সমাজের একটি প্রধান এবং উজ্জ্বল স্তস্তস্বরূপ বিবেচিত হইয়া 
থাকেন। হরিদাসঠাকুরের প্রতি তাহার বিশেষ শ্রদ্ধা ও 
আকর্ষণ ছিল। তিনি যত কাল পুরুষোত্তমক্ষেত্রে ছিলেন, 
হরিদাসঠাকুরের আশ্রমেই ছিলেন । মহাপ্রভু প্রতিদিন আসিয়া 
উভয়ের সহিত কৃষ্ণকথায় কিছুকাল অতিবাহিত করিয়। 
যাইতেন। 


অষ্টম পরিচ্ছেদ ১১৯ 


হরিদাসঠাকুরের আশ্রমে অবস্থানকালে শ্ত্রীব্ূপ গোস্বামী 
স্থপ্রসিদ্ধ “বিদগ্ধমাধব নাটক রচনা করিতেছিলেন। একদিন 
মহাপ্রভু হরিদাসের স্থানে আসিয়া উক্ত গ্রন্থের পাগুলিপি 
হাতে লইয়! উহার পাতা উপ্টাইতেই, একটি শ্লোক বিশেষভাবে 
তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। তিনি উহা পাঠ করিয়া একাস্ত 
মুগ্ধ ও ভাবাবিষ$ হইলেন, এবং হরিদ।স ঠাকুরকে শ্লোকটি 
পড়িয়া শুনাইলেন । 

হরিদাসঠাকুর শ্লোক শুনিয়া আনন্দে নৃত্য করিতে লাগিলেন 
এবং উহার শত প্রশংসা করিয়। বলিলেন, “নামমাহাতুযু সম্বন্ধে 
অনেক কথা সাধুমুখে শুনিয়াছি ও শাস্ত্রে দেখিয়াছি, কিন্তু 
.নামমাধু্য সম্বন্ধে এমন সুন্দর বর্ণনা আর কোথাও শুনি নাই।” 


“শ্লোক শুনি হরিদাস হইল উল্লাসী, 
নাচিতে লাগিল শ্লোকের অর্থ প্রশংসি, 
কষ্ণ-নামের মহিমা শাস্ত্-সাধুমুখে জানি, 
নামের মাধুর্য এছে কাহ। নাহি শুনি” 


( শ্রীচৈঃ চঃ) 


হরিদাস ঠাকুর যে শ্লোকটির এত প্রশংসা করিলেন, যাহা 
পাঠ করিয়। শ্রীমন্মহাপ্রভু ও হরিদাসঠাকুর উভয়েই ভাবারিষ্ট 
হইয়াছিলেন, সেই বিখ্যাত শ্লোকটি এই-_- 


“তুণ্ডে তাগ্ুবিনী রতিং বিতন্থতে তুগ্ডাবলীলব্বয়ে, 
কর্ণক্রোড়কড়ম্বিনী ঘটয়তে কণ্ীর্ব্বদেভ্যঃ স্পৃহাম্‌। 


১২০ ঠাকুর হরিদাস 
চেতঃ প্রাঙ্গণসঙ্গিনী বিজয়তে সর্বেন্দিক়্াণাং কৃতিং, 
নে! জানে জনিত। কিন্স্তিরমূতৈঃ কৃষ্ণেতি বর্ণদধয়ী |” 
শ্লোকার্থ। “কৃষ্ণ এই ছুইটি বর্ণ যখন বদনমধ্যে অর্থাৎ 
রসনায় নৃত্য করে, তখন অসংখা রসনা লাভ করিবার আকাঙক্ষা 
জন্মে ; যখন কর্ণ-কুহুরে ক্রীড়াশীল হয়, তখন অর্বব,দ অর্ধ 
রণপ্রাপ্তি বাসন জন্মে; আর্‌ যখন চিত্তপ্রাঙগণে যাইয়া প্রবিষ্ট 
হয়, তখন সমস্ত ইন্ড্রিয়ব্যাপার স্তরক্তিত হয়। আহা! এমন 
যে ছুটি বর্ণ কৃষ্ণনাম, তাহা যে কি অযুত দিয়া স্ষ্ট হইয়াছে, 
জানি না। 
শ্রীকৃষ্ণের প্রতি পুর্বব-রাগের অবস্থায় কৃষ্ণনামের মাধুর্ষ্যে 
বিহবলা ব্রজাঙ্গনার উক্তি এই শ্লোকে বিবৃত হইয়াছে । নিন্ব- 


লিখিত পদটি উক্ত শ্লোকের অনুবাদ। 
কীত্তনের স্ুর--ঝাঁপতাল। 

কৃষ্ণ ইতি আখর ছুটি, বদনে যব বিলসতি, 
বাঢ়য়ে রতি রসনা কোটি লাগি। (রে সখি) 

মম শ্রবণ-কন্দরে, যবন্থ পুন ক্রীড়তি, 
রতি শ্রবণ অর্বদ লাগ। (রে সখি) 

যবহু পুন পরশে হৃদি, প্রাণ মন ইন্দ্রিয়াদি 
স্তব্ধ রহ মানি বু ভাগি। (রে সথি) 

কতৃহু স্থধারস ছানি শ্জিল! বিহছি না! জানি 


ধনিরে ধনি মরমে রছ জাগি । (রে সথি) 
হরিনাম সকলেই করিয়া থাকেন । কিন্ত্রু নামের শক্তিতে 


অষ্টম পরিচ্ছেদ ১২১ 


তেমন জ্বলন্ত বিশ্বাস কয় জনের আছে £ শাস্ত্রে নামমাহাত্যু সম্বন্ধে 
যাহ! উক্ত হইয়াছে, তাহাতে বিশ্বীস না করা একটি নামাপরাধ। 
নামাপরাধ প্রধানতঃ দশটি ;-_€ ১) সাধুনিন্দা। (২) শ্রীশিবের 
সত্য, নাম, গুণ প্রভৃতি শ্রীনারায়ণ হইতে পৃথক্‌ জ্ঞান করা। 
(৩) শ্রীগুরুদেবে অবজ্ঞা অর্থাৎ সামান্য মনুষ্যুবুদ্ধি করা । 
(৪) হরিনামে অর্থবাদকল্পনা অর্থাৎ শ্রীহরিনামের মহিমা-সমূহকে 
কেবল প্রশংসামাত্র মনে করা । (৫) বেদাদি ধ্মশান্ত্ের 
নিন্দা। (৬) নাম-বলে পাপাচরণে প্রবৃত্তি । (*) শ্রীহরি- 
নামের সহিত ব্রত, দান প্রভৃতি শুভ কন্মের সমতুলনা। (৮) 
শ্রন্ধাহীন, বিমুখ এবং যে শুনিতে অনিচ্ছুক, তাহাকে নাম 
করিতে উপদেশ দেওয়া । (৯) নামমাহাত্্য শুনিয়াও নাম 
করিতে প্রবৃত্ত না হওয়া । (১০) নামে অহংমমতাপর হওয়া 
অর্থাৎ আমি বনু নামকীর্তন, গ্রহণ বা প্রচার করিয়া থাঁকি 
ইত্যাদি ভাব। নামাপরাধ হইলে পুনঃ পুনঃ নামগ্রহণ দ্বারাই 
সে অপরাধের ক্ষালন হইয়! থাকে । 

নাম-মাহাত্য্যে হরিদীস ঠাকুরের যেরূপ একাস্ত বিশ্বাস ছিল, 
তাহা সকলের আদর্শস্থানীয়। কণামাত্র অগ্নির সংযোগে পর্ববত- 
প্রমাণ তৃণরাশি ভস্মীভূত হইয়া যায়, ইহা! যেমন স্ুসত্য, তন্রপ 
হরিনামের আভাসেই জন্মজন্মান্তরের পাপপুঞ্জ দুরীকৃত হয়, 
ইহাঁও হরিদাসঠাকুরের নিকট তেমনই একটি স্বতঃসিদ্ধ' সত্য.৷ 
ইহার ভিতরে যেন-বুঝি-হয়ত নাই। 

একদিন মহাপ্রভু হরিদাসঠাকুরের কুটারে আসিয়া কৃষ্ণকথা- 


1১২২ ঠাকুর হরিদাস 


প্রসঙ্গে বলিলেন-_“দেখ হরিদাস! এই কলিকালে শ্রেচ্ছ প্রবল। 
তাহারা অনাচারী ও সতত গো-ব্রাহ্মণের হিংসা করিয়া থাকে। 
কিরূপে ইহাদিগের উদ্ধার হইবে, তাহা ভাবিয়া রে প্রাণে 
বড় ক্লেশ হয়।” 
ঠাকুর হরিদাস বলিলেন__“প্রভো ! সত্য বটে, যবনগণ 

মহ! সংসারাসক্ত ; সত্য বটে, তাহারা গোহত্যাকারী, দুরাচার- 
পরায়ণ ; কিন্ত্ত তথাপি উহার! সহজেই মুক্তি লাভ করিবে। 
উহারা যে কথায় কথায় “হারাম” শব্দ উচ্চারণ করে, তাহার 
ভিতরে রামনামের আভাস রহিয়াছে । এই নামাভাসেই তাহাদের 
উদ্ধার হইয়া যাইবে । নামের শক্তি কিছুতেই বিনষ্ট হয় না ।” 

“্যবন সকলের মুক্তি হবে অনায়াসে, 

হারাম! হারাম ! বলি কহে নামাভাসে । 

মহা প্রেমে ভক্ত কহে হারাম! হারাম! 

যবনের ভাগ্য দেখ লয় সেই নাম। 

যদ্তপি অন্তর সন্কেতে তাহা হয় নামাভাস, 


তথাপি নামের তেজ ন! হয় বিনাশ |” 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 


এ স্থলে হরিদাসঠাকুর নৃসিংহপুরাণের একটি শ্লোক আবৃত্তি 
করিয়৷ মহাঁপ্রভূকে শুনাইলেন। 


প্দংষ্ট্রিদংঘ্রাহতে! শ্নেচ্ছে! হারামেতি পুনঃ পুনঃ । 
উক্ত্যাপি যুক্তিমাপ্রোতি কিং পুনঃ শ্রদ্ধয়। গৃণন্‌ ॥* 


অর্থ। যখন বরাহদস্তে আহত হইয়া শ্লেচ্ছ “হারাম' “হারাম 


অষ্টম পরিচ্ছেদ ১২৩ 


উচ্চারণ করিয়াই মুক্তি লাভ করে, তখন শ্রদ্ধা পুর্ববক রামনাম 
কীর্তন করিলে যে মুক্তিলাভ হয়, তাহাতে আর বিচিত্র কি? 
ঠাকুর হরিদাস পুনরপি বলিলেন__“অজামিল আসন্নমৃত্যু- 
ভয়ে ভীত হইয়া পুজ্রের নাম ধরিয়া নারায়ণ-নারায়ণ বলিয়া 
ডাকিয়াছিলেন, তাহাতেই-_সেই নামাভামেই তিনি মুক্তিলাভ 
করিয়াছিলেন ।» 
“অজামিল পুক্র বোলায় বলি নারায়ণ, 


বিষুদৃত আসি ছাড়ায় তাহার বন্ধন” 
(শ্রীচৈঃ চঃ) 


তথাহি শ্রীমস্তাগবতে__ 
“মিয়মাণো হবের্নাম গৃণন্‌ পুল্রোপচারিতম্্‌। 
অজামিলোহপ্যগাদ্ধাম কিমুত শ্রদ্ধয়া গৃণন্‌ ॥” 


অর্থ। অজামিল মহাপাতকী হইয়াও পুজ্রোপচারিত 
নারায়ণ নাম উচ্চারণ করিয়া বৈকুষ্টে গমন করিয়াছিলেন, 
সুতরাং শ্রদ্ধপূর্ববক নামগ্রহণ করিলে যে জীব বৈকুষ্ঠধাম প্রাপ্ত 
হাবে, সে বিষয়ে আর কথা কি? 
“নামের অক্ষর সবের এই ত স্বভাব, 
ব্যবহিত হৈলেও না ছাড়ে আপন প্রভাব 1” 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 
ইহার দৃষ্টান্তম্বূপ নিম্লিখিতি শ্লোকটি আবৃত্তি 
করিলেন-_ 


১২৪ ্‌ ঠাকুর হরিদাস 


"নামৈকং যন্ত বাচি স্মরণপথগতং শ্রোত্রমূলং গতং বা, 
শুদ্ধং বাশুদ্ধবর্ণং বাবহিতরহিতং তারয়ত্যেব সত্ম্‌। 
তচ্চে্দেহদ্রবিণজনতালোভপাষগ্তমধো, 
নিক্ষিপ্ত স্তান্ন ফলজনকং শীত্রমেবাত্র বিপ্র ॥” 

(পগ্মপুরাণ ) 


অর্থ। ভগবানের নাম যাহার বাগিন্দ্িয়ে, স্মরণপথে, 
অথবা কর্ণমূলে উদিত হয়, অর্থাৎ যিনি ভগবানের নাম রসনায় 
উচ্চারণ করেন বা মানসে স্মরণ করেন অথবা কর্ণে শ্রবণ 
করেন, এই একমাত্র নামই তীহাকে উদ্ধার করে, ইহাতে 
অণুমাত্র সন্দেহ নাই। নামের বর্ণ শুদ্ধ, অশুদ্ধ, ব্যবহিত 
অথবা ব্যবধানরহিত, যেরূপই হউক না কেন, তাহাতে ফলের 
তারতম্য হয় না। কিন্তু যদি এই নাম দেহ-ধন-জনাসক্ত 
পাষগুমধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়, তাহ! হইলে, হে বিপ্র! এরূপ স্থলে 
নাম শীপ্রই ফলজনক হয় না, অর্থাৎ একটু বিলম্বে হয়। 

হরিদাসঠাকুরের নামমাহাত্য সম্বন্ধে উক্ত প্রকার জ্বলত্ত 
বিশ্বাসের কথাসকল শুনিয়া শ্রীমন্মহাপ্রভূু নিরতিশয় আনন্দ 
লাভ করিলেন। শ্রীগৌরাঙ্গ পুনরায় ভঙ্গী করিয়া কহিলেন__ 
“হরিদাস ! এই পৃথিবীতে অগণ্য অসংখ্য জীব ও স্থাবরজঙ্গম 
যত কিছু আছে, সে সকলের মুক্তি কিরূপে হইবে %” 

“পৃথিবীতে বনু জীব স্থাবর জঙ্গম, 


ইহা সবার কি প্রকারে হইবে মোচন ?* 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 


অষ্টম পরিচ্ছেদ ১২৫ 


তছুত্তরে হরিদাসঠাকুর বলিলেন-»“প্রভো ! সে ব্যবস্থা তুমি 
পূর্বেবই করিয়৷ রাখিয়াচ। তুমি যে উদ্দগ্ুড নৃত্য-কীর্তন 
করিয়াছ, তাহাতেই স্থাবরজঙ্গমের উদ্ধার হইয়া গিয়াছে। 
জীবগণ তোমার শ্রীমুখের হরিধবনি শুনিয়াই যুক্ত হইয়াছে, 
আর স্যানরসকলও সেই ধ্বনির তরঙ্গস্পর্শেই উদ্ধার পাইয়াছে। 
তুমি শ্রীবৃন্দাবন যাইবার কালে ঝারিখণ্ডের অরণ্যপথে যে 
কত হিংআ্র পশুকেও কৃষ্ণনামে কীদাইয়াছিলে, নাচাইয়াছিলে, 
সে সব কাহিনী আমার অবিদিত নাই ।৮ 


“হপিদাস কহে প্রভূ সে কূপা তোমার, 
স্থাবর জঙগমের আগে করিয়াছ নিস্তার । 
তুমি ষে করিয়াছ উচ্চৈঃস্থরে সংকীর্ভন, 
স্থাবর-জঙ্গমের সেই হয় ত শ্রবণ। 
শুনিয়াই জঙ্গমের হয় সংসার-ক্ষয়, 
স্থাবরের শব লাগি প্রতিধ্বনি হয়। 
প্রতিধ্বনি নহে সেই করয়ে কীর্তন, 
তোমার কৃপায় এই অকথ্য কথন। 
সকল জগতে হয় উচ্চ সংকীর্ভন, 

শনি প্রেমাবেশে নাচে স্থাবর জঙ্গম |” 


( শ্রীচৈঃ চঃ) 


নবম পাঁরচ্ছেদ 
সনাতন-সঙ্গ 

কিছুকাল গত হইলে শ্রীল সনাতন গোস্বামী শ্রীবৃন্দাবন 
হইতে মহাপ্রভুকে দেখিতে নীলাচলে আসিলেন, কিন্তু মহাপ্রভুর 
বাটাতে যাইয়া উঠিলেন না। শ্্রীরূপের ন্যায় তিনিও ঠাকুর 
হরিদাসের আশ্রমে গিয়া উপনীত হইলেন। সনাতন গোস্বামী 
রূপ গোস্বামী মহাশয়ের জোষ্ঠ সহোদর । তিনি গৌড়ের 
বাদশাহের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। তখন তীহার নাম হইয়াছিল 
সাকর মল্লিক। প্রাণে বৈরাগ্যের উদয় হওয়াতে তিনি সমস্ত 
বিষয়-আশয় পরিত্যাগ পুর্ববক শ্রীগৌরাঙ্গের পদে আত্মসমর্পণ 
করেন। ইনিও এক জন মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত ছিলেন। 
্বপ্রসিদ্ধ বৈষ্ণব স্মৃতিশান্ত্র 'হরিভক্তিবিলাস' ইহারই লেখনী- 
প্রসৃত। তত্তিন্ন “বৃহত্ভাগবতাম্ৃত, “দশম টিপ্লনী” ও “দশম 
চরিত, 'প্রভৃতি শাস্গরস্থ লিখিয়! ইনি বৈষ্ণবসমাজে সর্বজনপুজ্য 
হইয়াছেন। ইনিও শ্রীরূপের ন্যায় একান্ত দৈন্য ও বিনয় 
বশতঃই মহাপ্রভুর বাঁটীতে না গিয়া হরিদাসের কুটারেই আসিয়া 
আশ্রয় লইয়াছিলেন । 

সনাতন গোম্বামী সম্বন্ধে ভক্তমাল” বলেন-_ 


“মৃত্তিমান্‌ মহাতেজ, সমুদ্র-গম্তীর, 
সাগরাস্তা পৃথিবীর মধো এক ধীর)” 


বস্তুতঃ কি রূপগোস্বামী, কি সনাতন গোম্বামী, কি হরিদাস 


নবম পরিচ্ছেদ ১২৭' 


ঠাকুর, ইহীদের সংযম, বৈরাগ্য, ভক্তি ও শক্তির কথা ভাবিলে 
মনে হয় যে, পত্রক্মাণ্ড তারিতে শক্তি ধরে জনে জনে” এই 
কথা অতীব সত্য, যথার্থ কথা । অপর দিকে ইহীাদিগের 
নিক্ষিঞ্চনতা ও তৃণাদ্পি স্থনীচের ভাব দ্েখিয়াও বিস্মিত হইতে 
হয়। এই তিন মহাপুরুষ মর্য্যাদীলউবনভয়ে কদাচ শ্রীশ্বীজগন্নাথ 
দেবের শ্রীমন্দিরে যাইতেন না! 

“হরিদাস ঠাকুর শ্রীরূপ সনাতন, 

জগন্নাথ-মন্দিবে না যান তিন জন।” 

(শ্রীচৈঃ চঃ) 
শ্রীবন্দাবন হইতে আসিবাঁর কালে অরণ্য-প্রদেশের জলের 

দোষে সনাতন গোস্বামীর গাত্রে কণ্ত, উৎপন্ন হয়। শ্রীমন্মহা প্রভূ 
হরিদাস ঠাকুরের কুটারে যাইয়া উহাকে দেখিতে পাইয়াই 
অমনি আলিঙ্গন করিবার জন্য বানু প্রসারণ করিলেন, কিন্তু 
পাছে কগু,রস মহাপ্রভুর শ্রীঅঙ্গে লাগে, এই ভয়ে সনাতন 
দূরে রিয়া গেলেন। মহাপ্রভু তীহাকে জোর করিয়া আলিঙ্গন 
করিলেন। ইহাতে সনাতনের প্রাণে বড়ই দুঃখ হইল । সেই 
দুঃখে তিনি জগন্নাথের রথচক্রতলে পড়িয়। কণুরসায়িত ঘবণিত 
দেহ বিসর্জন দিতে মনে মনে সংকল্প করিলেন! মহাপ্রভু 
তাহার মনোগত ভাব অবগত হইয়া এক দিন ঠাকুর হরিদাসের 
আশ্রমে আসিয়৷ অকন্মা সনাতনকে বলিলেন-__- 

“সনাতন ! দেহত্যাগে কৃষ্ণ যদি পাইয়ে, 

কোটা দেহ ক্ষণেকে ত ছাড়িতে পারিয়ে । 


১২৮ ঠাকুর হরিদাস 


দেহত্যাগে কৃন্ট না পাই, পাইয়ে ভজনে, 
কৃষ্ণপ্রাপ্তির উপায় কোন নাহি ভক্তি বিনে ।” 
(শ্রীচ উঃ) 


প্রভূ কেমন করিয়া মনের কথা জানিতে পারিলেন) ইহা 

ভাবিয়া সনাতন একান্ত বিস্মিত হইলেন। মহাপ্রভু পুনরায় 
বলিলেন-_-“সনাতন ! তুমি আমাকে আত্মসমর্পণ করিয়াছ। 
স্থতরাং তোমার এই দেহ এক্ষণে আমার। অতএব ইহা 
বিনাশ করিবার অধিকার তোমার নাই। তুমি পরের দ্রব্য 
খোয়াইতে চাও, তোমার কি ধন্মাধন্ম-জ্ঞান নাই? এমন কাধ্য 
করিও না । এ শরীরে আমার বিশেষ প্রয়োজন আছে। এ শরীর 
দ্বারা আমি বহু কাধ্য সাধন করিব ।% 

"প্রভু কহে তোমার দেহ মোর নিজধন, 

তুমি মোরে করিয়াছ আত্মসমর্পণ । 

পরের দ্রব্য তুমি কেন চাহ বিনাশিতে, 

ধন্মাধ্শ বিচার কিবা! না পার করিতে ? 

তোমার শরীর মোর প্রধান সাধন, 


এ শরীরে সাধিব আমি বনু প্রয়োজন ।” 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 


সনাতন গোস্বামী লজ্জায় অধোবদনে রহিলেন। মহাপ্রভু 
ঠাকুর হরিদাসকে বলিলেন-_-“দেখ হরিদাস! আমরা এই 
নীতি-কথা বাল্যকাল হইতেই শুনিয়া আমিতেছি যে, পরের 
গচ্ছিত দ্রব্য কোনও প্রকারে খোয়াইতে নাই। কিন্তু ইনি 


নবম পরিচ্ছেদ ১২৯ 


পরের দ্রব্য নষ্ট করিতে চাহিতেছৈন। ইহাকে তুমি ভাল 
করিয়া সাবধান করিয়া দিও, যেন ইনি এমন অন্যায় কাধ্য 
না করেন ।” 


“হরিদাসে কহে প্রভূ শুন হরিদাস, 
পরের দ্রবা ইহু চাছে করিতে বিনাশ । 
পরের স্থাপা দ্রব্য কেহ না খায় বিলায়, 
নিষেধিও ইহায্, যেন না করে অন্তায় ।” 
( আ্ীাঠৈ: চঃ) 


মহাপ্রভু চলিয়া গেলে হরিদাস ঠাকুর সনাতন গোস্বামীকে 
বলিলেন--“গোসাঞ্ ! তোমার মতন ভাগ্যবান কে ? তোমার 
দেহকে মহাপ্রভু তাহার নিজের দ্রব্য বলিয়া জ্ঞান করেন, 
এ দেহ দ্বারা তিনি কত কাধ্য করাইয়া লইবেন। আর তুমি 
ইহাকে বিনাশ করিতে চাও ? গোস্বামি ! তুমি ধন্য! কেন না, 
তোমার দেহ প্রভুর কাজে লাগিবে। কিন্তু আমার কি 
দুর্ভাগ্য যে, আমি তীহার নিজের কোনও কাজে আসিলাম না । 
এই পুণ্যতৃমি ভারতে জন্মগ্রহণ করিয়া, এ জীবন ব্যর্থ গেল।” 


“তোমার দেহ কহে প্রভু “মোর নিজ ধন, 
তোম। সম ভাগ্যবান নহে কোন জন । 
আমার এই দেহ প্রভুর নিজ কার্যে না লাগিল, 
ভারতভূমিতে জন্মি এই দেহ ব্যর্থ গেল।” 
(শ্রীচৈঃ চঃ) 
৯ 


১৩০ ঠাকুর হরিদাস 


জীনাতন কহিলেন-__ 

“হরিদাস! তুমি কি বলিতেছ 1? তোমার ঠা প্রভুর 
কার্ধো লাগিল না? প্রভুর গণের মধ্যে তোমার । মতন 
সৌভাগ্যশালী ব্যক্তি ত আমি দ্বিতীয় দেখিতেছি না। ফলির 
জীবে হরিনাম বিতরণের নিমিত্তই প্রভুর ধরাধামে আগমন । 
স্তীহার সেই নিজ কার্য, প্রভূ .তোমার দ্বারা সম্পন্ন করিতেছেন । 
তুমি প্রতিদিন তিন লক্ষ নাম লও এবং সকলকে শুনাও । 
কেহ বা আচার করে, কিন্ত্ত প্রচার করে না, অপর কেহ বা 
প্রচার করে, কিন্তু আচার করে না। তুমি উভয় কাধ্যই 
কর। অতএব তোমার সমান কে? তুমি সকলের গুরু, 
তুমি জগতের আধ্য 1” 

“আপনি আচরে কেহ না করে প্রচার, 
প্রচার করয়ে কেহ না করে আচার। 
আচার প্রচার নামের কর তই কার্য, 
তুমি সব্বগুর তুমি জগতের আর্ধা 1” 
( শ্রীচৈঃ চঃ)' 
শ্রীমন্তাগবতে উক্ত হুইয়াছে__ 
“তব কথামৃতং তগুজীবনং 
কবিতিরীড়ীতং কল্মষাপহম্‌। 
শ্রবণমশলং শ্রীমদাততং 
ভূবি গৃণস্তি ষে ভূরিদা! জনাঃ ॥” 


অর্থ । ত্বদীয় বাক্যামৃত প্রতপ্ত জনের জীবনস্বরূপ, 


নবম পরিচ্ছেদ ১৩১৯ 


্রহ্মবিদ্গণের সংস্তুত ও পাপহর। উহা শ্রবণমাত্র কল্যাণ ও 
শান্তি লাভ হয়। ধরাতলে ধাহারা বিস্তারিতরূপে তাহা পান 
করান, তাহারাই ভূরিদাতা ও ধন্য । 

ঠাকুর হরিদাসের কথা শেষ হইয়া আনসিল। তাহার 
জীবনের অনেক ঘটনাই অন্ভাত। নীলাচলে আসিয়া তিনি 
পনর ষোল বগুসর কাল জীবিত ছিলেন। এই সময়ে তিনি 
আপন আশ্রমে থাকিয়া অহনিশি সাধন-ভজনেই রত থাকিতেন। 
তবে মহাপ্রভূর অনুরোধে কখন কোথাও যাইতেন, এইমাত্র । 
আমরা পূর্ব্বেই এক স্থলে বলিয়াছি যে, শ্রীগৌরাঙ্গলীলায় 
প্রবেশ করিয়া তিনি আপনাকে সেই লীলা-তরঙ্গে একবারে 
ডুবাইয়। দ্িয়াচিলেন। এই কারণেও তাহার জীবনে ঘটনা- 
বাহুল্য দৃষ্ট হয় না। কিন্তু তিনি যে দিবারাত্রিতে তিন লক্ষ 
হরিনাম জপ করিতেন, এই একটি ঘটনাই লক্ষ ঘটনার তুল্য, 
ইহাতে সন্দেহ নাই। আচার দ্বারা ষে প্রচার,.তাহাই শ্রেষ্ঠ 
প্রচার। হরিদাস ঠাকুর ৭৫ বৎসর কাল ধরাধামে ছিলেন 
তীহার এই স্থুদীর্ঘ জীবনের শেষ দিন পধ্যস্ত প্রতিদিন তিন 
লক্ষ হরিনাম তাহার রসনাষ উচ্চারিত হইয়া গগনে-পবনে ফে 
কি শক্তি, কি মঙ্গল-প্রীভাব বিস্তার করিয়াছে, কত কোটা অর্ববূদ 
ভূঁচর খেচর প্রাণী সেই শ্রবণ-মঙ্গল হরিনামের শক্তিতে মুক্তির 
পথ প্রাপ্ত হইয়াছে, তাহা কে বলিতে পারে? সেই বেগা- 
পৌলের জঙ্গলে হরিদাস ঠাকুরের দেবকণট হইতে যে জগন্মক্গল 
হরিনামের ধব্নি উশ্খিত হইয়া মহোদধির কুলে .. আসিয়! 


১৩২ ঠাকুর হরিদাস 


স্রীজগন্নাথের পাদপদ্মে /বিলীন হইয়াছিল, সেই ধ্বনি, সেই 
সঙ্গীত, সেই সুর, সেই স্বব, অগ্ভাবধি মকত-ব্যোমে ধ্বনিত 
রহিয়াছে । যাহার শুনিবার কান আছে, তিনি শুমেন__ 
ঠাকুর হরিদাস গাইতেছেন-__ 


“ভরে কৃষ্ণ ভরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হবে ভরে, 
ভরে রাম হরে রাম রামএ্ররাম ভরে ভরে |” 


মহাপ্রস্থান 


পূর্ব্বে বলিয়াছি যে, মহাপ্রভুর সেবক ভাগ্যবান গোবিন্দ 
প্রতিদিন ঠাকুর হরিদাসের আশ্রমে তাহার জন্য মহা প্রসাদ 
লইয়। আমিতেন। হরিদাস ঠাকুর দিবারাত্রি বসির। বসিয়াই 
হরিনাম করিতেন, কখনও শয়ন করিতেন না। কিন্তু এক 
দিবস গোবিন্দ মহাপ্রসাদ দিতে আসিয়া দেখেন যে, ঠাকুর 
শয়ন করিয়া আছেন এবং ক্ষীণকণ্টে সংখ্যানাম কীর্তন করিতে- 
ছেন। গোবিন্দ বলিলেন, “ঠাকুর! আজ যে শয়ন করিয়া ? 
উঠিয়া প্রসাদ গ্রহণ করুন ৮ 

ঠাকুর হরিদাস বলিলেন--“অস্ভ আমার এখন পর্যযস্ত 
নিয়মিত সংখ্যাকীর্তন সমাপ্ত হয় নাই। তাই ভাবিয়াছি, আজ 
লঙ্ঘন দিব । কিন্তু মহাপ্রসাদ আনিয়াছ, তাহাইবা কেমন 


মহা প্রস্থান ১৩৩ 


করিয়া উপেক্ষা করি?” এই বলিয়া এক কণিকা মহাপ্রসাদ 
লইয়া প্রণাম পুর্ববক তাহা গ্রহণ করিলেন। 

গোবিন্দ মহাপ্রভুর নিকট যাইয়া হরিদাস ঠাকুরের অবস্থা 
জানাইলেন। মভাপ্রভু পরদিন নিয়মিত সময়ে হরিদাসের 
আশ্রমে আসিয়া তাহার কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন । হরিদাস 
মহাপ্রভৃকে প্রণাম করিয়া বলিলেন--“শরীর অস্থস্থ নহে 
মোর, অস্মস্থ বুদ্ধি মন ।৮ 

মহাপ্রভু বলিলেন_-“হরিদ্াস! তোমার কি ব্যাধি, তাহা 
আমাকে নিশ্চয় করিয়া বল।” 

হরিদাস উত্তর করিলেন-_-“আর কিছু নয় প্রভো ! আমি 

খ্যা-জপ পুর্ণ করিতে পারিতেছি না” 

মহাপ্রভু বলিলেন_-“হরিদাস ! এখন বৃদ্ধ হইয়াছ, এখন 
হইতে নাম-সংখ্যা অল্প কর। তুমি সিদ্ধ পুরুষ, তোমার আবার 
সাধনের জন্য এত আগ্রহ কেন? আমি জানি যে” কেবল 
লোক-নিস্তারের নিমিত্তই তোমার জনম্ম। তাহা ত যথেষ্ট 
করিয়াছ। তুমি এ জগতে নামের মহিমা অল্প প্রচার কর নাই ।” 

তখন হরিদাস ঠাকুর আবেগপূর্ণ হৃদয়ে গদ্গদ কণ্টে বলিতে 
লাগিলেন-_-“প্রভো ! আমার মনে লইতেছে যে, তুমি অচির- 
কাল মধ্যেই লীল৷ সাঙ্গ করিবে । প্রতো ! তোমার দোহাই, 
যেন সে লীলা আমার চক্ষে দেখিতে না হয়। তোমার নিকট 
আমার এই কাতর প্রার্থনা যে, যেন তোমার সম্মুখে এই দেহ 
বিসর্জন দ্রিতে পারি। বড় সাধ প্রভো! এ প্রাণ যাইবার 


১৩৪ ঠাকুর হারদাস 


কালে তোমার চরণকমল হৃদয়ে ধারণ করিব, নয়নে তোমার ও 
চাদ-বদন দর্শন করিব এবং রসনায় শ্রীকৃষ্জচৈতন্য নাম উচ্চারণ 
করিতে করিতে চলিয়া যাইব। কৃপা করিয়া আমাকে এই 
আশীর্বাদ কর, যেন আমার মনের সাধ পুর্ণ হয়” 


“হৃদয়ে ধরিব তোমার কমলচরণ, 
নয়নে দেখিব তোমার টাদ বদন । 
জিহবায় উচ্চারিব তোমার কৃষ্ণচৈতন্ত নাম, 
এই মত মোর ইচ্ছা ছাড়িৰ পরাণ ।” 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 


মহাপ্রভু কহিলেন-_“হরিদাস! তুমি যাহা প্রার্থনা করিবে, 
কৃষ্ণ তাহাই অবশ্য পূর্ণ করিবেন। কিন্তু তুমি আমাকে ছাড়িয়া 
যাইবে, ইহ! তোমার উচিত নহে। আমার যাহা কিছু সুখ 
তোমাকে লইয়া । 
“কিন্ত আমার যে কিছু সুখ সব তোমা লঞ্া, 


তোমার যোগা নহে যাবে আমারে ছাড়িয়া |” 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 


ঠাকুর হরিদাস মহাপ্রভুর চরণ ধরিয়া কাকুতি করিয়া 
বলিলেন-_-প্প্রভো ! আমাকে ছলন! করিও না। আমার এই 
আকাঙ্ক্ষা পুর্ণ করিতেই হইবে। তোমার লীলার সহায় কত 
কত মহাশয় আছেন--আমি ধাহাদিগকে আমার মাথার মণি 
জদ্কান করি, এমন কত শত শত ভক্ত রহিয়াছেন। আমি কীট। 


মনা প্রস্থান ১৩৫ 


আমি মরিলে পৃথিবার কিছুই হানি নাই । * একটা ক্ষুদ্র পিপী- 
লীকা মরিলে তাহাতে জগতের কি আসিয়। যায়? ঠাকুর ! 
আমার এই বাসন! অপূর্ণ রাখিও না।” 


“আম! হেন এক কাট যদি মরি গেল, 
এক পিপীলীক মৈলে পরথিবার কাহা। হানি হৈল।” 


( শ্রীচৈ: ৮১) 


মহাপ্রভু আর কোনও উত্তর না করিয়া গম্ভীর হইয়। চলিয়া 
গেলেন এবং বলিয়া গেলেন যে, পরদিন প্রাতে পুনরায় 
আসিবেন। ঠাকুর হরিদাস পরদিনের প্রতীক্ষায় সারাদিন 
সারারাত্রি ব্যাকুলপ্রাণে নাম কীর্তনে কাটাইলেন। ১৪৪৭ শক, 
ভাদ্র মাস। অস্ত শুর্লা-অনস্ত-চতুর্দশী । অগ্য প্রভাতে মহাপ্রভু 
জগবন্ধু দর্শন করিয়া হরিদাসের আশ্রমে আসিয়া উপৃস্থিত 
হইলেন । প্রতিদিন আসেন দুই একটি মাত্র ভক্ত সঙ্লে লইয়া, 
আজ সাঙ্গোপাঙ্গ লইয়া আসিয়াছেন। ঠাকুর হরিদাস আঙ্গিনায়” 
আসিয়। আগে মহাপ্রভুর চরণ বন্দনা করিলেন, পরে ভক্তবুন্নকে, 
প্রণাম করিলেন। মহাপ্রভু হরিদাসের কুশল জিজ্ঞাসা করিলে 
হরিদীন এই মাত্র বলিলেন-_“প্রভো ! যেমন তোমার কৃপা 1” 
হরিদাস ঠাকুরের মনোগত ভাব জানিতে পারিয়া মহাপ্রভু 
তখন তক্তবুন্দকে সংকীর্তন করিতে অনুমতি দিলেন ।* স্বরূপ 
গোসাঞ্রি প্রভৃতি ভক্তগণ মিলিয়া হরিদাসের আঙ্গিনায় মহা- 
ংকীর্তন আরম্ভ করিয়া দিলেন। তীহার! ঠাকুর হরিদাসকে 


১৩৬ ঠাকুর হরিদাস 


প্রদক্ষিণ করিয়া "কীর্তন করিতে লাগিলেন। এই কীত্বনে 
বক্রেশ্বর পণ্ডিত খুব নাচিলেন। ঠাকুর হরিদাসের উঠিবার 
শক্তি ছিল না। তিনি বসিয়া বসিয়া অশ্রুচ কম্প, পুলকাদি।অষ্ট 
সান্তিক ভাবে আকুল হইতেছিলেন। কিছুক্ষণ পরে কীর্তবন 
থামিল। সকলে ঠাকুরকে ঘেরিয়া বসিলেন। রায় রামানন্দ 
ও সার্বভৌম ভভ্টাচার্যয প্রভৃতি সকল বৈষ্ণবের নিকট মহা প্রভু 
অধীর হইয়া হরিদাসের গুণ কীর্তন করিতে লাগিলেন । 

সকল ভক্ত ঠাকুর হরিদাসকে প্রণাম করিলেন। হরিদাস 
তাহা দেখিতে পাইলেন না । কারণ তিনি এক মনে এক দৃষ্টিতে 
চাহিয়া কেবল শ্রীগৌরাঙ্গের রূপমাধুরীই নিরীক্ষণ করিতে- 
ভিলেন । মহাপ্রভু একটু ব্যবধানে বসিয়াছিলেন ; হরিদাস সে. 
ব্যবধান সহিতে পারিতেছিলেন না । তিনি মহ্াপ্রভূকে নিজের 
সম্মুখে আনিয়া বসাইলেন এবং তাহার চরণযুগল হৃদয়ে ধারণ 
করিয়া .রহিলেন। ঠাকুর হরিদাসের বদন প্রফুল্ল, থাকিয়! 
'থাকিয়া সর্ববাঙগ রোমাঞ্চিত হইতেছে, অশ্রা/বিগলিত নয়নে 
্মীগৌরাঙ্গের বদন পানে নিনিমেষে চাহিয়া আছেন ; মুখে অন্য 
কোনও কথা নাই, কেবল '্রীকৃষ্জচৈতন্য” 'শ্রীকৃষ্চৈতন্' 
উচ্চারণ করিতেছেন; তাহাতেই যেন মরমের কত কথ৷ 
ব্যক্ত হইতেছে । মহাপ্রভু বুঝিলেন, মহাপ্রস্থানের আর বিলম্ব 
নাই । 

“হরিদাস নিজাগ্রেতে প্রভু বসাইল, 
নিজ নেত্র ছুই ভূঙ্গ মুখপন্মে দিল। 


মহাপ্রস্কান ১৩৭ 


স্বহদয়ে আনি ধরিল প্রভুর চরণ, 
সর্বভক্ত পদরেণু মন্তকে ভূষণ । 
শীকৃষ্ণটচৈতন্য নাম বলে বার বার, 
প্রভুমুখ মাধুরী পিয়ে নেত্রে জলধার। 
শ্রীরুষ্ণচৈতন্ট শব্দ করি উদ্চারণ, 
নামের সহিত প্রাণ কৈল উৎক্রামণ।» 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 


হরিবোল ! হরিবোল ! এমন স্বেচ্ছাম্ৃত্যু, মহাযোগীর ন্যায় 
এমন স্বচ্ছন্দ মরণ কেহ কখনও দেখে নাই। যেন ভীম্মের 
নিধাণ! ঠাকুর হরিদাসের এহেন স্থখের মরণ দেখিয়! ভক্তবুন্দ 
মুহুমুহ্ঃ হরিধ্বনি করিতে লাগিলেন এবং সকলে মিলিয়া 
তারস্বরে হরিসংকীর্তন আরম্ভ করিলেন। চতুদ্দিক হইতে শত 
শত লোক আসিয়া সেই কীর্তনে যোগ দিল। দেখিতে দেখিতে 
ঠাকুর হরিদাসের আঙ্গিনা লোকে লোকারণা হইল । সংকীর্তন- 
-কোলাহল উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল । মহা প্রভু. -শ্ীশচী- 
নন্দন প্রেমে বিহবল হইয়া ঠাকুর হরিদাসের দেহ বক্ষে তুঙ্গিয়া' 
লইলেনু এবং উহা স্কন্ধে স্থাপন করিয়া মহাভাবে নৃত্য করিতে 
লাগিলেন। 
“হবিদাসের তন্থু প্রভু কোলে উঠাউয়া, 
অঙ্গনে নাচেন প্রভু প্রেমাবিষ্ট হঞা ।” 
( শ্রীচৈঃ চঃ) 


মরি ! মরি !.কি অপুর্ব দৃশ্য ! ভক্ত-দেহ স্কন্ধে করিয়া 


১৩৮ ঠাকুর হরিদাস 


প্রভু নৃত্য করিতেছেন! /এ দৃশ্য দেখিতে বুবিবা তকালে 
স্বর্গের দেবতারাও সেখানে আসিয়াছিলেন। সেই দৃশ্য দেখিয়া, 
তক্তবাসল্যের সেই অপূর্বব চরম দৃষ্টান্ত দেখিয়া, ভক্তবুন্দ ও 
সমবেত জনসঙ্ঘ মহাপ্রভুর নামে ও ঠাকুর হরিদাসের নামে মহা 
জয়ধ্বনি করিতে লাগিলেন, এবং নাচিয়া গাহিয়া ও অঙ্গে ঠাকুর 
হরিদাসের আঙ্গিনার ধুলা মাখিয়া আপনাদিগকে কৃতার্থ মনে 
করিতে লাগিলেন । জয় শচীনন্দন ? জয় শচীনন্দন । জয় 
হরিদাস ! জয় হরিদাস ! 
ভক্তবৃন্দ হরিদাস ঠাকুরের দেহ বিমানে ( চতুর্দদোলায় ) 

চড়াইয়া হরিসংকীর্তন করিতে করিতে সমুদ্রতীরে * ন্বর্গদারে, 
লইয়া গেলেন। সে স্থানে দীড়াইয়া কিছুকাল কীর্তন হইল। 
পরে সমুদ্রের জল তুলিয়া ঠাকুর হরিদাঁসকে স্নান করান হইল । 
তক্তগণ ঠেলাঠেলি করিয়া হরিদাসের পাদোদক পান করিতে 
লাগিলেন । শ্রীমন্মহাপ্রভৃু বলিলেন__“হরিদাসের ন্নান-জলে 
সমুদ্র আজ মহাতীর্থ হইল ।” 

“্রিদ[সে সমুদ্র জলে ম্লান করাইল, 

প্রভু কহে সমুদ্র এই মহাতীর্ঘথ হেল। 

হরিদাসের পাদ্দোদক পিয়ে ভক্তগণ, 

হরিদাসের অঙ্গে দিল প্রসাদ চন্দন ।” 

( গ্রাচৈঃ চঃ) 


৭ দ্রগহার, শ্রীক্ীজগন্নাথ কেত্রের সমূক্রতীরের অংশবিশেষের নাম | শ্বর্গঘারে 
ঠাকুর হরিদাসের সমাধি-স্থান বর্তমান রহিঘ্নাছে। সে শ্বানে প্রতিদিন ঠাকুরের 
পৃজ। হইয়৷ থাকে এবং অনস্ত চতুর্দশীতে উৎসব হয়।